নীল সমুদ্র, সাদা বালুর সৈকত আর পানির ওপর ভাসতে থাকা বিলাসবহুল রিসোর্ট মালদ্বীপের ছবি মনে পড়লেই এমন দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আর সঙ্গে আসে আরেকটি ধারণা, ‘মালদ্বীপ মানেই বুঝি অনেক টাকা খরচ!’
আসলে বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয়। বিলাসী রিসোর্টে কয়েক রাত কাটালে খরচ যে বেশ চড়া হবে, তা ঠিক। তবে একটু পরিকল্পনা করে গেলে কম বাজেটেও মালদ্বীপ ঘুরে দেখা সম্ভব। বিলাসবহুল রিসোর্টের বদলে স্থানীয় দ্বীপে থাকা, গণপরিবহন ব্যবহার এবং আগেভাগে ভ্রমণ পরিকল্পনা করলেই অনেকটা খরচ কমানো যায়।
মালদ্বীপে ভ্রমণের সবচেয়ে বড় খরচের একটি অংশ হতে পারে থাকার জায়গা। তাই পানির ওপর তৈরি বিলাসবহুল রিসোর্টের বদলে স্থানীয় মানুষের বসবাসের দ্বীপে থাকা যেতে পারে।
স্থানীয় দ্বীপগুলোতে তুলনামূলক কম দামে অতিথিশালা ও ছোট হোটেল পাওয়া যায়। সেখানে থাকার পাশাপাশি স্থানীয় জীবনযাপন কাছ থেকে দেখার সুযোগও মেলে। অর্থাৎ একই সঙ্গে বাজেট বাঁচবে, আবার মালদ্বীপকে শুধু রিসোর্টের জানালা দিয়ে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভেতর থেকেও দেখা হবে।
মালদ্বীপের রাজধানী মালে থেকেও ভ্রমণের অনেকটা উপভোগ করা যায়। শহরটি ছোট হলেও ব্যস্ত, প্রাণবন্ত এবং স্থানীয় জীবনযাপনের স্বাদ পাওয়ার জন্য বেশ আকর্ষণীয়।
মালে থেকে আশপাশের দ্বীপে নৌযানে যাওয়া যায়। ফলে প্রতিদিন রিসোর্টে থাকার জন্য বড় অঙ্কের টাকা খরচ না করে শহরে থাকার পাশাপাশি এক বা দুই দিনের জন্য সমুদ্রভ্রমণের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
মালদ্বীপে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যেতে স্পিডবোট দ্রুত ও আরামদায়ক হলেও খরচ তুলনামূলক বেশি। বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য স্থানীয় ফেরি হতে পারে অনেক সাশ্রয়ী বিকল্প।
তবে ফেরির সময়সূচি সীমিত এবং সব দ্বীপে প্রতিদিন যাতায়াত নাও থাকতে পারে। তাই হোটেল বুকিংয়ের আগে সংশ্লিষ্ট দ্বীপে ফেরি চলাচলের সময় জেনে নিন। একটু ধীরগতির ভ্রমণ হলেও এতে সমুদ্রের দৃশ্য উপভোগ করার বাড়তি সুযোগ তো থাকছেই!
সমুদ্রের ধারে বসে দামি রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই ভালো। কিন্তু প্রতিটি খাবার যদি পর্যটনকেন্দ্রিক রেস্তোরাঁয় হয়, তাহলে ভ্রমণ বাজেট দ্রুত ফুলে উঠতে পারে।
স্থানীয় খাবারের দোকান বা ছোট রেস্তোরাঁয় খেলে তুলনামূলক কম খরচে খাবার পাওয়া যায়। মাছ, ভাত, তরকারি কিংবা স্থানীয় বিভিন্ন পদ দিয়ে দিব্যি পেট ভরানো যায়। এতে খরচও কমবে, আবার মালদ্বীপের স্থানীয় খাবারের স্বাদও নেওয়া হবে।
মালদ্বীপে কখন যাচ্ছেন, তার ওপর ভ্রমণ খরচ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে। পর্যটকের চাপ বেশি থাকে এমন সময়ে বিমান, হোটেল ও বিভিন্ন পর্যটনসেবার দাম বাড়তে পারে।
তাই ভ্রমণের তারিখে কিছুটা নমনীয়তা থাকলে তুলনামূলক কম ব্যস্ত সময়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন। টিকিট ও থাকার জায়গা যত আগে বুক করা যায়, তত ভালো দামের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
মালদ্বীপে গিয়ে একসঙ্গে অনেক দ্বীপ ঘুরতে গেলে যাতায়াতের খরচ দ্রুত বাড়তে পারে। বরং নিজের পছন্দ অনুযায়ী একটি বা দুটি দ্বীপ বেছে নিয়ে সেখানে কয়েক দিন থাকা যেতে পারে।
সৈকতে বসে সূর্যাস্ত দেখা, সমুদ্রে সাঁতার কাটা কিংবা স্নরকেলিং এসব উপভোগ করতে সব সময় পাঁচ তারকা রিসোর্টের প্রয়োজন হয় না। স্থানীয় দ্বীপেও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে।
মালদ্বীপে নানা ধরনের জলক্রীড়া ও সমুদ্রভিত্তিক আয়োজন রয়েছে। তবে প্রতিটি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের পছন্দের দু-একটি অভিজ্ঞতা বেছে নিলেই চলে।
যেমন স্নরকেলিং করতে চাইলে আগে কয়েকটি জায়গার দাম তুলনা করে দেখতে পারেন। দলবদ্ধভাবে কোনও নৌভ্রমণে গেলে ব্যক্তিগতভাবে নৌকা ভাড়া করার তুলনায় খরচ কম হবে।
ঢাকা থেকে মালদ্বীপ যাওয়ার আগে শুধু বিমানের টিকিটের দাম দেখলেই হবে না। বিমানবন্দর থেকে যে দ্বীপে থাকবেন সেখানে পৌঁছানোর খরচ, থাকার খরচ, খাবার, দ্বীপ বদলের পরিবহন এবং ঘোরাঘুরির খরচ সব মিলিয়েই বাজেট তৈরি করা উচিত।
বিশেষ করে স্থানীয় দ্বীপে থাকার পরিকল্পনা করলে আগে থেকেই জেনে নিন, আপনার হোটেল বিমানবন্দর থেকে কীভাবে পৌঁছাতে বলছে এবং শেষ ফেরি বা নৌযান কখন ছাড়ে। দেরি করে পৌঁছে দামি ব্যক্তিগত নৌযান ভাড়া করার পরিস্থিতিতে পড়লে সাশ্রয়ের পুরো পরিকল্পনাই উল্টে যেতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, ভ্রমণের আগে মালদ্বীপের প্রবেশসংক্রান্ত বর্তমান নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং থাকার বুকিংয়ের শর্ত যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
মালদ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে পানির ওপর বিলাসবহুল ভিলায় থাকতেই হবে এমন কোনও নিয়ম নেই। বরং স্থানীয় দ্বীপে থাকা, স্থানীয় খাবার খাওয়া, ফেরিতে চলাচল এবং সীমিত কয়েকটি অভিজ্ঞতা বেছে নিলে তুলনামূলক কম বাজেটেও স্বপ্নের এই দ্বীপদেশ ঘুরে দেখা সম্ভব।
অর্থাৎ মালদ্বীপে যাওয়ার আগে প্রশ্নটা ‘কত টাকা খরচ করব?’ না হয়ে হতে পারে ‘কোথায় থাকব, কীভাবে যাব আর কোন অভিজ্ঞতার জন্য টাকা খরচ করব?’ পরিকল্পনাটা ঠিকঠাক হলে বিলাসবহুল রিসোর্টের বাইরে থাকা মালদ্বীপও কিন্তু কম সুন্দর নয়।