সূর্য ডোবার পর জঙ্গলে ঢোকার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চকর। অন্ধকারে শিকারে বের হওয়া হায়েনা, মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পেঁচা কিংবা ঘাসের আড়ালে অদৃশ্য কোনও প্রাণীর মৃদু শব্দে রাতের সাফারি হয়ে উঠতে পারে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
আফ্রিকার বিস্তীর্ণ সাভানা হোক কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় জঙ্গলের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আচরণ। তাই ৪x৪ গাড়িতে চড়ে রাতের সাফারিতে বের হওয়ার আগে কিংবা তারাভরা আকাশের নিচে গাইডেড নাইট ওয়াকে যাওয়ার সময় কিছু বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি।
কারণ সামান্য অসতর্কতাও শুধু আপনার সাফারির অভিজ্ঞতা নষ্ট করতে পারে না, বরং আপনাকে এবং বন্যপ্রাণী দু’পক্ষকেই বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
সে কারণে রাতের সাফারিতে যাওয়ার আগে জেনে নিন, কোন ছয়টি কাজ কখনোই করা উচিত নয়।
১. ছবি তুলতে ফ্ল্যাশ ব্যবহার করবেন না
রাতের সাফারিতে ছবি তোলার সময় ফ্ল্যাশ ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। অন্ধকারে কোনও সিংহ, চিতাবাঘ কিংবা সিভেটের চোখে আলো পড়লে মুহূর্তেই ছবি তোলার লোভ হতে পারে। কিন্তু ক্যামেরার তীব্র ফ্ল্যাশ বন্যপ্রাণীকে চমকে দিতে পারে, তাদের স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং সংবেদনশীল চোখের ক্ষতিও করতে পারে।
তাই ছবি তুলতে হলে কম আলোতে উপযোগী ক্যামেরা সেটিংস ব্যবহার করুন। পেশাদারভাবে রাতের বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতে চাইলে উপযুক্ত নাইট ফটোগ্রাফির সরঞ্জাম ব্যবহার করাই ভালো। আর সরঞ্জাম না থাকলে ক্যামেরার পেছনে না ছুটে নিজের চোখেই প্রকৃতির সেই বিরল দৃশ্য উপভোগ করুন।
২. উজ্জ্বল বা প্রতিফলকযুক্ত পোশাক পরবেন না
রাতের সাফারিতে উজ্জ্বল রঙের পোশাক বা আলো প্রতিফলিত করে এমন পোশাক এড়িয়ে চলুন। নিয়ন রঙের জ্যাকেট কিংবা হাই-ভিজিবিলিটি ভেস্ট আপনার উপস্থিতিকে বন্যপ্রাণীর কাছে সহজেই দৃশ্যমান করে তুলতে পারে। এতে প্রাণীরা চমকে যেতে পারে বা স্বাভাবিক আচরণ থেকে সরে যেতে পারে।
এর বদলে অলিভ, বাদামি, ধূসর বা কালোর মতো নিরপেক্ষ রঙের পোশাক বেছে নিন। এসব রং পরিবেশের সঙ্গে সহজে মিশে যায়।
আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার, সাফারির আগে অতিরিক্ত কড়া পারফিউম বা কোলোন ব্যবহার না করাই ভালো। তীব্র গন্ধও বন্যপ্রাণীর জন্য বিরক্তিকর হতে পারে।
৩. জোরে কথা বলবেন না
সাফারিতে গিয়ে গল্প-আড্ডা কিংবা মজা করার ইচ্ছা হতেই পারে। কিন্তু রাতের জঙ্গলে যতটা সম্ভব নীরব থাকা জরুরি। জোরে কথা বললে বন্যপ্রাণী আপনার উপস্থিতি টের পেয়ে দূরে সরে যেতে পারে। ফলে প্রাণী দেখার বদলে দীর্ঘ সময় শুধু অন্ধকার জঙ্গল আর ঝোপঝাড় দেখেই কাটাতে হতে পারে।
অনেক প্রাণী শিকার, আত্মগোপন এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য শব্দের ওপর নির্ভর করে। আপনার অতিরিক্ত শব্দ তাই তাদের স্বাভাবিক আচরণেও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
গাইডের প্রয়োজনীয় প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই করুন, তবে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলুন। বরং চারপাশের রাতের স্বাভাবিক শব্দ ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পাতার মর্মর কিংবা দূরে কোনো প্রাণীর আওয়াজ মন দিয়ে শুনুন। রাতের সাফারির অন্যতম আকর্ষণই হলো এই শব্দময় নীরবতা।
৪. দল থেকে আলাদা হয়ে যাবেন না
ভালো করে দেখার জন্য ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েক পা এগিয়ে যাওয়া কিংবা ছবি তোলার জন্য দলের বাইরে চলে যাওয়া কোনোটিই করবেন না।
রাতের সাফারিতে দৃশ্যমানতা কম থাকে, ভূখণ্ডও অনেক সময় অপরিচিত হয়। অন্ধকারে শিকারি প্রাণীরাও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে গাইডের সঙ্গে পায়ে হেঁটে সাফারি করলেও দল থেকে আলাদা হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
অনেক বন্যপ্রাণী শিকার ধরতে বা নিজেদের নিরাপদ রাখতে নিঃশব্দে ও আড়ালে চলাফেরা করে। তাই জঙ্গলে নিজের ইচ্ছায় কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে কোনও প্রাণীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। বিশেষ করে চিতাবাঘের মতো শিকারির ক্ষেত্রে এমন ভুল ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।
৫. গাইডের অনুমতি ছাড়া টর্চ জ্বালাবেন না
অনেক রাতের সাফারিতে বন্যপ্রাণীর ওপর আলোর প্রভাব কমানোর জন্য লাল ফিল্টারযুক্ত টর্চ ব্যবহার করা হয়। এগুলো প্রাণীর চোখে তুলনামূলকভাবে কম বিরক্তি তৈরি করে এবং রাতের স্বাভাবিক পরিবেশও বজায় রাখতে সাহায্য করে।
তাই নিজের সঙ্গে থাকা শক্তিশালী এলইডি টর্চ হঠাৎ করে জ্বালিয়ে দেবেন না। আচমকা তীব্র আলোয় কোনও প্রাণী ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে পারে, আবার আত্মরক্ষার জন্য আক্রমণাত্মক আচরণও করতে পারে।
কোনো কিছু দেখতে টর্চ ব্যবহার করতে হলে আগে গাইডকে জানান। কখন, কোথায় এবং কীভাবে আলো ব্যবহার করা নিরাপদ এ বিষয়ে গাইডের নির্দেশনাই অনুসরণ করুন।
৬. গাইডের নির্দেশনা উপেক্ষা করবেন না
আপনি যতই বন্যপ্রাণী বিষয়ক তথ্যচিত্র দেখে থাকুন না কেন, রাতের সাফারিতে আপনার গাইডই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এলাকার ভূপ্রকৃতি, প্রাণীদের আচরণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
গাইড যদি বসে থাকতে বলেন, বসে থাকুন। নীরব থাকতে বললে নীরব থাকুন। দল থেকে দূরে যেতে নিষেধ করলে কোনোভাবেই নিজের মতো করে এগিয়ে যাবেন না।
রাতের সাফারি সাধারণত নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও সংরক্ষণবিধি মেনে পরিচালিত হয়। এসব নিয়ম উপেক্ষা করলে শুধু আপনার নিরাপত্তাই ঝুঁকিতে পড়বে না, বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে। কিছু জাতীয় উদ্যানে নিয়ম ভাঙলে জরিমানার ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
তাই রাতের সাফারিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো গাইডের কথা শুনুন, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন এবং বন্যপ্রাণীকে তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে থাকতে দিন।
মনে রাখবেন, রাতের সাফারির আসল সৌন্দর্য হলো অন্ধকারের মধ্যে প্রকৃতিকে তার নিজস্ব ছন্দে দেখা। ভালো ছবি বা কাছ থেকে প্রাণী দেখার তাড়নায় এমন কোনও কাজ করবেন না, যা আপনার কিংবা বন্যপ্রাণীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দায়িত্বশীল পর্যটক হিসেবে নিয়ম মেনে চললেই রাতের সাফারি হয়ে উঠতে পারে আরও নিরাপদ, উপভোগ্য এবং স্মরণীয়।









