নিউইয়র্ক বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও আকর্ষণীয় শহর। টাইমস স্কয়ারের আলো, ব্রডওয়ে শো, স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ম্যানহাটনের ব্যস্ত রাস্তা কিংবা সাবওয়ে সব মিলিয়ে শহরটি পর্যটকদের জন্য নানা অভিজ্ঞতায় ভরপুর।
বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর অনেক পর্যটক যুক্তরাষ্ট্রের এই শহরে ভ্রমণে যান। তবে প্রথমবার নিউইয়র্কে গেলে শহরের ব্যস্ততা ও পর্যটনকেন্দ্রিক ভিড়ের সুযোগ নিয়ে কিছু প্রতারণার ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এনডিটিভি জানিয়েছে, অননুমোদিত টিকিট বিক্রেতা, অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া রাইড থেকে শুরু করে রাস্তায় অপরিচিত ব্যক্তির অযাচিত সাহায্য বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পর্যটকদের সতর্ক থাকা উচিত। আগে থেকে এসব সম্পর্কে জানা থাকলে প্রতারণা এড়ানো অনেকটাই সহজ।
১. টাইমস স্কয়ারে সাজসজ্জার চরিত্রদের সঙ্গে ছবি
টাইমস স্কয়ারে বিভিন্ন জনপ্রিয় চরিত্রের পোশাক পরা ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তোলা পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। তবে ছবি তোলার পর তারা বকশিশ চাইতে পারেন। একাধিক চরিত্র ছবিতে যুক্ত হলে প্রত্যেকেই আলাদা করে টাকা চাইতে পারেন।
তাই ছবি তুলতে চাইলে আগে থেকেই বকশিশের পরিমাণ এবং কারা ছবিতে থাকবেন, তা পরিষ্কার করে নিন।
২. ভুয়া সন্ন্যাসী ও ব্রেসলেট বিক্রেতা
কেউ কেউ সন্ন্যাসীর মতো পোশাক পরে পর্যটকদের কাছে এসে ব্রেসলেট বা কোনও ছোট উপহার দিতে পারেন। পরে সেটির বিনিময়ে অনুদান বা টাকা দাবি করা হতে পারে। কেউ আপনার হাতে জোর করে কোনো জিনিস পরিয়ে দিতে চাইলে ভদ্রভাবে না বলুন এবং সেখানে দাঁড়িয়ে আলোচনা না করে এগিয়ে যান।
৩. ভুয়া পিটিশনে সই
রাস্তায় অপরিচিত কেউ কোনো সামাজিক উদ্যোগ বা সংগঠনের নামে পিটিশনে সই করতে বলতে পারেন। পরে অনুদান চাওয়া হতে পারে। সংগঠনটি সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে কিংবা অস্বস্তি বোধ করলে সই বা টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সহজভাবে না বলে চলে যাওয়াই নিরাপদ।
৪. সস্তায় ব্রডওয়ে টিকিটের প্রলোভন
নিউইয়র্কে গিয়ে ব্রডওয়ে শো দেখা অনেক পর্যটকেরই ভ্রমণতালিকায় থাকে। ফলে রাস্তায় কেউ কম দামে টিকিট দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু অননুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা টিকিট ভুয়া, অবৈধ বা অতিরিক্ত দামের হতে পারে। ব্রডওয়ে কিংবা ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের কোনও অনুষ্ঠানের টিকিটও অফিসিয়াল বক্স অফিস বা অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম থেকে কেনা উচিত।
৫. স্ট্যাচু অব লিবার্টির টিকিট নিয়ে প্রতারণা
নিউইয়র্কের অন্যতম জনপ্রিয় আকর্ষণ স্ট্যাচু অব লিবার্টি। এর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে অননুমোদিত বিক্রেতারা পর্যটকদের টিকিট দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যাওয়ার জন্য অনুমোদিত ফেরি পরিষেবা স্ট্যাচু সিটি ক্রুজেস। তাই আশপাশে কেউ কম দামে বা ‘অফিসিয়াল’ টিকিট দেওয়ার দাবি করলে সতর্ক থাকুন।
৬. ভুয়া রাইড বা অননুমোদিত ট্যাক্সি
বিমানবন্দর কিংবা পর্যটন এলাকায় অপরিচিত কেউ নিজে থেকে গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে পারেন। বিশেষ করে প্রথমবার নিউইয়র্কে যাওয়া পর্যটকেরা এমন প্রস্তাবে বিভ্রান্ত হতে পারেন। তাই অচেনা কারও প্রস্তাবে গাড়িতে না উঠে অনুমোদিত হলুদ ট্যাক্সি কিংবা পরিচিত রাইডশেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করুন।
৭. পেডিক্যাবের ভাড়া আগে জেনে নিন
নিউইয়র্কে পর্যটন এলাকায় পেডিক্যাব বা তিন চাকার যাত্রীবাহী সাইকেল দেখা যায়। এতে ওঠার আগে ভাড়ার বিষয়টি পরিষ্কার না করলে শেষে বড় অঙ্কের বিলের মুখে পড়তে পারেন। তাই ওঠার আগেই জেনে নিন ভাড়া কীভাবে হিসাব করা হবে এবং মোট কত টাকা দিতে হতে পারে।
৮. খাবার ও আইসক্রিমের দামে চমক
নিউইয়র্ক ঘুরতে গিয়ে খাবারের ট্রাক বা আইসক্রিম বিক্রেতার কাছ থেকে খাবার কেনা সহজ ও আকর্ষণীয়। কিন্তু অর্ডার দেওয়ার আগে দাম দেখে নিন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্ক সিটিতে মোবাইল ফুড ভেন্ডরদের দাম প্রদর্শনের নিয়ম রয়েছে। দাম পরিষ্কার না থাকলে মূল্যতালিকা দেখতে চাইতে পারেন।
৯. ‘থ্রি কার্ড মন্টে’ খেলায় যাবেন না
রাস্তায় ভিড় করে কেউ তাসের খেলা খেলছে এমন দৃশ্য দেখলে কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ‘থ্রি কার্ড মন্টে’ ধরনের খেলায় দর্শকদের মধ্যে থাকা কিছু মানুষ আসলে আয়োজনের অংশ হতে পারেন। তারা জিতছে দেখে মনে হতে পারে আপনিও সহজেই টাকা জিততে পারবেন।
এ ধরনের খেলায় না জড়িয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
১০. লাগেজ বা ওএমএনওয়াই ব্যবহারে অচেনা ব্যক্তির সাহায্য নেবেন না
বিমানবন্দর বা রেলস্টেশনে কেউ আপনার লাগেজ বহন করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে পরে বড় অঙ্কের বকশিশ চাইতে পারেন। একইভাবে সাবওয়ে স্টেশনে কেউ ওএমএনওয়াই ব্যবহারে সাহায্যের কথা বলে আপনার ব্যাংক কার্ড, নগদ টাকা বা পেমেন্টের তথ্য চাইলে সতর্ক থাকুন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেরাই অফিসিয়াল পেমেন্ট সুবিধা ব্যবহার করুন।
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য আরও কিছু সতর্কতা
নিউইয়র্কে ভ্রমণের সময় বিশেষ করে ভিড়ের জায়গা যেমন টাইমস স্কয়ার ও সাবওয়ে স্টেশনে ব্যাগ, মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস নিরাপদে রাখুন। রাস্তায় চলার সময় যানবাহনের ব্যাপারেও সতর্ক থাকুন। রাতে কোনও এলাকা অপরিচিত হলে আলোকিত ও ব্যস্ত রাস্তা ব্যবহার করাই ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপরিচিত কেউ নিজে থেকে সাহায্য, টিকিট, ছবি, সস্তা রাইড বা কোনও অফার নিয়ে এগিয়ে এলে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হবেন না। দাম যাচাই করুন, প্রয়োজন হলে না বলুন এবং সম্ভব হলে অফিসিয়াল পরিষেবা ব্যবহার করুন।
নিউইয়র্কের মতো বড় শহরে প্রতিটি অপরিচিত মানুষকে সন্দেহ করার প্রয়োজন নেই। তবে অযাচিত প্রস্তাব, অস্বাভাবিকভাবে কম দাম কিংবা অতিরিক্ত চাপ দিয়ে কিছু বিক্রির চেষ্টা হলে সতর্ক থাকা জরুরি। সামান্য সচেতনতাই বাংলাদেশি পর্যটকদের নিউইয়র্ক ভ্রমণকে আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে।