ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় এখন অনেকেই আগে দেখে নেন গুগল, ফেসবুক কিংবা বিভিন্ন ভ্রমণ প্ল্যাটফর্মের রিভিউ। কোন হোটেলে থাকা ভালো, কোথায় খাবার মানসম্মত, কোন পর্যটনকেন্দ্রে পরিবেশ কেমন কিংবা কোন ট্যুর গ্রুপের সেবা কেমন এসব জানার ক্ষেত্রে অনলাইন রিভিউ বেশ কাজে আসে। তবে ইন্টারনেটে থাকা প্রতিটি মন্তব্য বা রেটিং যে নির্ভরযোগ্য, তা নয়।
কোনও জায়গায় যাওয়ার আগে অনলাইন রিভিউ দেখা ভালো, কিন্তু সেটিকে একমাত্র তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। কারণ একজন পর্যটকের ভালো অভিজ্ঞতা অন্য পর্যটকের জন্য একই রকম নাও হতে পারে। কারও কাছে একটি সাধারণ মানের হোটেলও ভালো মনে হতে পারে, আবার অন্য কেউ একই জায়গার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তুষ্ট হতে পারেন।
রিভিউ যাচাইয়ের শুরুতেই দেখতে হবে সেগুলো কতটা সাম্প্রতিক। কয়েক বছর আগে কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টের যে সুনাম ছিল, বর্তমানে সেটি একই অবস্থায় নাও থাকতে পারে। মালিকানা পরিবর্তন, কর্মী পরিবর্তন, সংস্কার, রাস্তার অবস্থা কিংবা সেবার মান বদলে যাওয়ার কারণে পুরোনো রিভিউ অনেক সময় বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তাই সম্ভব হলে সাম্প্রতিক কয়েক মাসের মন্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শুধু মোট রেটিং দেখেও সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। পাঁচ তারকা বা চার তারকা রেটিং দেখে ভালো মনে হলেও এর পেছনের মন্তব্যগুলো পড়া দরকার। বিশেষ করে মানুষ কোন বিষয় নিয়ে প্রশংসা করেছে এবং কোন বিষয়ে অভিযোগ করেছে, সেটি খেয়াল করলে বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
একই ধরনের অভিযোগ বারবার দেখা গেলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেমন কোনও হোটেল সম্পর্কে একাধিক পর্যটক যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অতিরিক্ত টাকা নেওয়া, খারাপ ব্যবহার বা বুকিংয়ের সঙ্গে বাস্তব সেবার পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেন, তাহলে বিষয়টি আলাদাভাবে যাচাই করা উচিত। আবার কোনও রেস্টুরেন্ট নিয়ে অনেকেই খাবারের মান বা পরিবেশন নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ করলে সেটিও উপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
অন্যদিকে মাত্র একটি নেতিবাচক মন্তব্য দেখেই কোনও প্রতিষ্ঠান বা স্থানকে খারাপ ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। একজন পর্যটকের ব্যক্তিগত কোনও সমস্যা বা প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার ঘটনাও নেতিবাচক রিভিউয়ের কারণ হতে পারে। তাই বিচ্ছিন্ন মন্তব্যের বদলে একই ধরনের অভিজ্ঞতা একাধিক মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
রিভিউয়ের ভাষাও অনেক কিছু বলে দিতে পারে। খুব সাধারণ, একই ধরনের ভাষায় লেখা অসংখ্য প্রশংসা কিংবা অল্প সময়ের মধ্যে একসঙ্গে অনেক ইতিবাচক মন্তব্য দেখা গেলে সেগুলোর স্বাভাবিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার শুধু অভিযোগ করেই লেখা মন্তব্যও সবসময় পুরো পরিস্থিতি তুলে ধরে না। তাই বিস্তারিত অভিজ্ঞতা, ছবি এবং নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া রিভিউ সাধারণত বেশি কার্যকর।
ছবিযুক্ত রিভিউ বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে। কোনও হোটেল বা রিসোর্টের অনলাইন প্রচারের ছবির সঙ্গে অতিথিদের দেওয়া সাম্প্রতিক ছবির মিল আছে কি না, তা দেখে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একইভাবে পর্যটনকেন্দ্রের রাস্তা, পরিবেশ বা থাকার জায়গার সাম্প্রতিক ছবি পুরোনো প্রচারণার ছবি থেকে আলাদা হতে পারে।
তবে ছবিকেও চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা উচিত নয়। ছবি নির্দিষ্ট একটি সময়ের অবস্থা দেখায়। কোনও পর্যটনকেন্দ্র বর্ষায় যেমন থাকে, শুষ্ক মৌসুমে তার চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। হোটেলের একটি সুন্দর কক্ষের ছবি দেখানো হলেও বুকিংয়ের সময় একই ধরনের কক্ষ পাওয়া যাবে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার।
ভ্রমণের আগে শুধু হোটেল বা রেস্টুরেন্টের রিভিউ নয়, পুরো গন্তব্য সম্পর্কিত সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও খুঁজে দেখা ভালো। রাস্তার অবস্থা, স্থানীয় পরিবহন, পর্যটকদের ভিড়, নিরাপত্তা, আবহাওয়া কিংবা কোনো সাময়িক নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে অন্য ভ্রমণকারীদের সাম্প্রতিক পোস্ট অনেক তথ্য দিতে পারে।
রিভিউ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি উৎসের ওপর নির্ভর না করাই সবচেয়ে নিরাপদ। গুগল রিভিউয়ের পাশাপাশি ফেসবুকের সাম্প্রতিক পোস্ট, ভ্রমণকারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। এতে কোনও একটি প্ল্যাটফর্মের ভুল বা পুরোনো তথ্যের ওপর নির্ভর করার ঝুঁকি কমে।
ট্যুর গ্রুপ বা ভ্রমণ প্যাকেজের ক্ষেত্রে রিভিউ যাচাই আরও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আয়োজকের নিজের পেজে দেওয়া প্রশংসা না দেখে অন্য ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতা খুঁজে দেখা উচিত। প্যাকেজে কী থাকার কথা ছিল এবং বাস্তবে কী পেয়েছেন এমন তথ্য পাওয়া গেলে সেটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ভালো রিভিউ মানেই সবকিছু নিখুঁত হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে কয়েকটি খারাপ রিভিউ মানেই জায়গাটি এড়িয়ে যেতে হবে, সেটিও নয়। রিভিউকে মূলত সম্ভাব্য অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত।
ভ্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো অনলাইন রিভিউকে ‘ইঙ্গিত’ হিসেবে নেওয়া, ‘চূড়ান্ত সত্য’ হিসেবে নয়। সাম্প্রতিক রিভিউ পড়ুন, একই অভিযোগ বা প্রশংসা বারবার আছে কি না দেখুন, ব্যবহারকারীদের ছবি ও বিস্তারিত অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখুন এবং সম্ভব হলে একাধিক উৎস থেকে তথ্য নিশ্চিত করুন।
শেষ পর্যন্ত কয়েক মিনিটের এই যাচাইই ভ্রমণের সময় বড় ধরনের হতাশা বা অপ্রত্যাশিত খরচ থেকে বাঁচাতে পারে। কারণ অনলাইনের পাঁচ তারকা রেটিং যতই আকর্ষণীয় হোক, ভ্রমণের আসল অভিজ্ঞতা নির্ভর করে সেই জায়গার বর্তমান বাস্তবতার ওপর।