দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর জন্য এখন ফেসবুকভিত্তিক ট্যুর গ্রুপ, অনলাইন ট্রাভেল কমিউনিটি ও ছোট-বড় ট্যুর অপারেটরের সংখ্যা বেড়েছে। কম খরচে পাহাড়, সমুদ্র, হাওর কিংবা জঙ্গল ঘুরে দেখার সুযোগের পাশাপাশি এসব গ্রুপের মাধ্যমে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গ্রুপের অনেক সদস্য, সুন্দর ছবি কিংবা নিয়মিত ট্যুর আয়োজন দেখেই সেটিকে নির্ভরযোগ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ভ্রমণে যাওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান টাকা নিচ্ছে তার পরিচয় ও বৈধতা যাচাই করা। বিশেষ করে ট্যুর প্যাকেজের নামে অগ্রিম টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটু অসতর্কতাই পরে আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের নিবন্ধিত ট্যুর অপারেটরদের জন্য অনলাইন তালিকা রয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের নাম, নিবন্ধন নম্বর এবং নিবন্ধনের মেয়াদসহ বিভিন্ন তথ্য দেখা যায়। তাই কোনও গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের নামে ট্যুর প্যাকেজ নেওয়ার আগে সেটি সরকারি তালিকায় আছে কি না দেখে নেওয়া ভালো।
তবে শুধু একটি ফেসবুক পেজ বা গ্রুপের নাম দেখেই যাচাই শেষ করা উচিত নয়। গ্রুপটি কোনও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অফিস, যোগাযোগের নম্বর এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরিচয় মিলিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নিবন্ধন ব্যবস্থায় ট্যুর অপারেটরের ব্যবসায়িক তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের বিষয়টি রয়েছে। ফলে আয়োজক প্রতিষ্ঠান যদি বৈধ ব্যবসায়িক পরিচয় দিতে না চায়, সেটি সতর্ক হওয়ার একটি কারণ হতে পারে।
ট্যুর গ্রুপের আগের কার্যক্রমও যাচাই করা যায়। শুধু প্রশংসাসূচক মন্তব্য নয়, যারা আগে ওই গ্রুপের সঙ্গে ভ্রমণ করেছেন তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বললে বাস্তব অভিজ্ঞতা জানা সম্ভব। হোটেলে থাকার মান, খাবারের ব্যবস্থা, পরিবহন, সময়সূচি, অতিরিক্ত খরচ কিংবা আয়োজকদের আচরণ এসব বিষয়ে পুরোনো অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। ট্যুরিস্ট পুলিশও কোনও প্যাকেজ নেওয়ার আগে গ্রুপ বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্যতা, বৈধ ব্যবসায়িক লাইসেন্স এবং আগের গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে।
প্যাকেজের দাম অস্বাভাবিক কম হলেও সতর্ক হওয়া দরকার। একই ধরনের রুটে অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্যাকেজের তুলনায় যদি কোনও গ্রুপের খরচ অনেক কম হয়, তাহলে কেন এত কম সেটি পরিষ্কারভাবে জেনে নিতে হবে। কম দামের পেছনে পরিবহন, খাবার, থাকার ব্যবস্থা বা প্রবেশ ফি বাদ থাকার বিষয় থাকতে পারে। আবার পরে ‘অতিরিক্ত খরচ’ হিসেবে নতুন টাকা চাওয়া হতে পারে। তাই টাকা দেওয়ার আগে প্যাকেজে ঠিক কী কী অন্তর্ভুক্ত এবং কী কী অন্তর্ভুক্ত নয়, তা লিখিতভাবে জেনে নেওয়া ভালো। ট্যুরিস্ট পুলিশও অস্বাভাবিক কম দামের অফারকে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে।
টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রেও সাবধানতা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর আগে অ্যাকাউন্টটি কার নামে, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী এবং টাকা দেওয়ার পর কোনো রসিদ বা বুকিং প্রমাণ পাওয়া যাবে কি না এসব নিশ্চিত করা উচিত। সম্ভব হলে প্যাকেজের শর্ত, ভ্রমণের তারিখ, পরিবহন, থাকার জায়গা এবং টাকা ফেরতের নিয়ম লিখিতভাবে সংরক্ষণ করে রাখা ভালো।
বিদেশ ভ্রমণের মতো দেশীয় ভ্রমণেও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে কোনো গ্রুপ যদি শুধু দেশীয় ভ্রমণ আয়োজন না করে টিকিট, বিদেশ ভ্রমণ, ভিসা বা অন্যান্য ট্রাভেল এজেন্সি সেবা দেওয়ার দাবি করে, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। সরকার জানিয়েছে, ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং নিবন্ধনহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ এজেন্সির সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাভেল এজেন্সির ক্ষেত্রে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের সদস্যপদও আলাদাভাবে যাচাই করা যায়। সংগঠনটির ওয়েবসাইটে সদস্য যাচাই এবং সদস্য তালিকা দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কোনও প্রতিষ্ঠানের শুধু কোনও সংগঠনের সদস্য হওয়াকেই একমাত্র নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে না দেখে সরকারি নিবন্ধন ও প্যাকেজের বাস্তব তথ্যও মিলিয়ে দেখা উচিত।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা মানেই কোনও গ্রুপ বৈধ বা নিরাপদ, এমন নয়। একইভাবে অনেক সদস্য, জনপ্রিয় অ্যাডমিন, ভালো ছবি কিংবা পরিচিত ইনফ্লুয়েন্সারের সঙ্গে ছবি থাকাও প্রতিষ্ঠানের বৈধতার প্রমাণ নয়। বরং আয়োজকের পরিচয়, সরকারি নিবন্ধন, অফিসের ঠিকানা, পূর্বের ভ্রমণের রেকর্ড, প্যাকেজের লিখিত বিবরণ এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ।
ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য সহজ নিয়ম হলো আগে যাচাই, পরে টাকা। যে গ্রুপ বা আয়োজক নিবন্ধনের তথ্য দিতে চায় না, প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর দেয় না, অস্বাভাবিক কম দামে প্যাকেজ দেয় কিংবা টাকা নেওয়ার পর কোনও লিখিত প্রমাণ দিতে অনীহা দেখায়, তাদের সঙ্গে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দ্বিতীয়বার ভাবা উচিত।
দেশের ভেতরে ঘোরার আনন্দ যেন একটি ভুল সিদ্ধান্তে আর্থিক ক্ষতি বা ভোগান্তিতে পরিণত না হয়, সেজন্য কয়েক মিনিটের যাচাইই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি।
সরকারি তালিকায় কোনও ট্যুর অপারেটরের নাম খুঁজতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ট্যুর অপারেটর তালিকা ব্যবহার করা যায়।









