ভারতের ভ্রমণ মানচিত্রে রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশ কিংবা গোয়ার মতো স্থানের নামই সাধারণত আগে আসে। তবে এবার সেই পরিচিত তালিকার বাইরে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে মধ্যপ্রদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রাচীন ইতিহাস, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণীর মেলবন্ধনে ভারতের এই রাজ্যটি হয়ে উঠছে ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় এক গন্তব্য।
মধ্যপ্রদেশে যেমন রয়েছে সবুজে ঘেরা পাহাড় ও ঝরনা, তেমনই রয়েছে প্রাচীন মন্দির, ঐতিহাসিক দুর্গ, বৌদ্ধ স্থাপত্য এবং ঘন জঙ্গলে বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ। ফলে এক রাজ্যেই ভ্রমণের নানা স্বাদ পাওয়া সম্ভব।
ভারতীয় পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকরাও এখন পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধান করছেন। সেই জায়গায় মধ্যপ্রদেশ হতে পারে বেশ ভালো একটি বিকল্প। ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখার পাশাপাশি প্রকৃতির সান্নিধ্যও মিলবে এখানে।
খাজুরাহোর মন্দিরে মুগ্ধ করবে প্রাচীন শিল্প
মধ্যপ্রদেশে গেলে খাজুরাহো ভ্রমণ না করলে যেন ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা খাজুরাহো তার প্রাচীন মন্দির এবং পাথরের গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
চন্দেল রাজবংশের সময় নির্মিত এই মন্দিরগুলোর স্থাপত্য ও ভাস্কর্য আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। ইতিহাস, সংস্কৃতি কিংবা প্রাচীন স্থাপত্যে আগ্রহ থাকলে খাজুরাহো আপনার ভ্রমণতালিকায় রাখতেই পারেন।
পাহাড়-ঝরনায় পাঁচমাড়ির সবুজ সৌন্দর্য
‘সাতপুরার রানি’ নামে পরিচিত পাঁচমাড়ি মধ্যপ্রদেশের একমাত্র পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র। সবুজ বন, ঝরনা এবং প্রাকৃতিক গুহায় ঘেরা এই জায়গা শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক দিনের জন্য দূরে থাকার আদর্শ ঠিকানা হতে পারে।
পাঁচমাড়িতে ঘুরে দেখা যায় বি ফলস, জটাশঙ্কর গুহা এবং ধূপগড়। মধ্যপ্রদেশের সর্বোচ্চ স্থান ধূপগড় থেকে উপভোগ করা যায় চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য। আরামদায়ক আবহাওয়া ও সবুজ পরিবেশের কারণে প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে পাঁচমাড়ির আকর্ষণ আলাদা।
আধ্যাত্মিকতার আবহে উজ্জয়িনী
ধর্মীয় পর্যটনের জন্য মধ্যপ্রদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য উজ্জয়িনী। হিন্দুধর্মের সাতটি পবিত্র নগরীর অন্যতম এই শহরের প্রধান আকর্ষণ মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির।
শিপ্রা নদীর তীরে গড়ে ওঠা উজ্জয়িনী কুম্ভমেলার জন্যও বিখ্যাত। প্রাচীন ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবহ এবং প্রাণবন্ত পরিবেশ মিলিয়ে শহরটি ভ্রমণকারীদের জন্য তৈরি করে এক আলাদা অভিজ্ঞতা।
জঙ্গলে বাঘ দেখার রোমাঞ্চ বান্ধবগড়ে
বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের কাছে বান্ধবগড় জাতীয় উদ্যান বিশেষ আকর্ষণের। প্রাকৃতিক পরিবেশে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দেখার জন্য ভারতের অন্যতম পরিচিত জায়গা এটি।
ঘন জঙ্গল ও বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি এখানে চিতা, হরিণ, বুনো শূকর এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়। জঙ্গলের সাফারিতে বন্যপ্রাণী দেখার রোমাঞ্চ ভ্রমণকে করে তুলতে পারে আরও স্মরণীয়।
মার্বেল পাহাড় আর জলপ্রপাতের ভেড়াঘাট
জবলপুরের কাছে ভেড়াঘাট প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। নর্মদা নদীর দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল মার্বেল পাথরের পাহাড় এবং ধুয়াঁধার জলপ্রপাত এখানকার প্রধান আকর্ষণ।
নর্মদার বুকে নৌকায় চড়ে মার্বেল পাহাড়ের মাঝ দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য বিশেষ। চাঁদের আলোয় সাদা পাথরের পাহাড়ের সৌন্দর্য আরও মোহময় হয়ে ওঠে। ছবি তুলতে ভালোবাসেন এমন ভ্রমণকারীদের কাছেও ভেড়াঘাট দারুণ একটি গন্তব্য।
দুর্গ ও রাজপ্রাসাদের শহর গোয়ালিয়র
ইতিহাস ও রাজকীয় স্থাপত্যের স্বাদ পেতে চাইলে গোয়ালিয়র হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত বিশাল গোয়ালিয়র দুর্গ শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। দুর্গ থেকে গোটা শহরের মনোরম দৃশ্যও দেখা যায়।
এছাড়া জয় বিলাস প্রাসাদ এবং বিভিন্ন প্রাচীন মন্দির গোয়ালিয়রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। দুর্গ, প্রাসাদ, স্থাপত্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে শহরটি মধ্যপ্রদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।
বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাক্ষী সাঁচি
প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে সাঁচিতে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা এই স্থান ভারতের সমৃদ্ধ বৌদ্ধ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
সম্রাট অশোকের নির্মিত গ্রেট স্তূপ বা মহাস্তূপ সাঁচির প্রধান আকর্ষণ। প্রাচীন স্থাপত্য, ধর্মীয় ইতিহাস এবং শান্ত পরিবেশের কারণে ইতিহাসপ্রেমী ও আধ্যাত্মিকতার সন্ধানী পর্যটকদের কাছে সাঁচির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
কেন ভ্রমণতালিকায় রাখবেন মধ্যপ্রদেশ?
প্রাচীন মন্দিরের শিল্পকলা দেখতে চাইলে খাজুরাহো, পাহাড়ি প্রকৃতির স্বাদ পেতে চাইলে পাঁচমাড়ি, ধর্মীয় অভিজ্ঞতার জন্য উজ্জয়িনী, বন্যপ্রাণীর রোমাঞ্চের জন্য বান্ধবগড়, নদী ও পাহাড়ের সৌন্দর্যের জন্য ভেড়াঘাট, রাজকীয় ইতিহাসের জন্য গোয়ালিয়র কিংবা বৌদ্ধ ঐতিহ্য জানতে চাইলে সাঁচি এক রাজ্যেই রয়েছে এত বৈচিত্র্য।
তাই শুধু পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে ভ্রমণকে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধানে থাকলে মধ্যপ্রদেশ হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের অন্যতম সেরা ঠিকানা।