ইউরোপ ভ্রমণের জন্য শেনজেন ভিসা হাতে পেলেই যাত্রাপথের সব দেশের ভিসা-সংক্রান্ত ঝামেলা শেষ হয়ে যায় এমন ধারণা অনেকেরই থাকতে পারে। কিন্তু ইউরোপের কোনও দেশে যাওয়ার পথে যুক্তরাজ্যের বিমানবন্দরকে ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহার করলে বিষয়টি আলাদা। কারণ শেনজেন এলাকার নিয়ম এবং যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ও ট্রানজিট ব্যবস্থা এক নয়।
বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য সরকারের বর্তমান নির্দেশনায় বাংলাদেশকে এমন দেশগুলোর তালিকায় রাখা হয়েছে, যাদের নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ বা ট্রানজিটের ক্ষেত্রে সাধারণত ভিসার প্রয়োজন হয়।
ধরুন, ঢাকা থেকে ইউরোপের কোনও দেশে যাওয়ার সময় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিবর্তন করতে হবে। আপনার কাছে গন্তব্য দেশের বৈধ শেনজেন ভিসা রয়েছে এবং দুই ফ্লাইট একই বুকিংয়ের আওতায়। তারপরও শুধু এই দুটি বিষয় দেখে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে যুক্তরাজ্যের কোনও ট্রানজিট ভিসা লাগবে না।
বিমানবন্দরের ভেতরে থাকলেও লাগতে পারে ভিসা
যুক্তরাজ্য হয়ে ট্রানজিট মূলত দুই ধরনের হতে পারে। যদি যাত্রী যুক্তরাজ্যের বর্ডার কন্ট্রোল পার না হয়ে বিমানবন্দরের এয়ারসাইড এলাকার মধ্যে থেকে পরবর্তী ফ্লাইট ধরেন, সেটি এয়ারসাইড ট্রানজিট। আর বর্ডার কন্ট্রোল পার হয়ে লাগেজ সংগ্রহ, বিমানবন্দর পরিবর্তন বা অন্য কোনও কারণে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে হলে সেটি ল্যান্ডসাইড ট্রানজিট হিসাবে বিবেচিত হয়।
এয়ারসাইড ট্রানজিটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ডাইরেক্ট এয়ারসাইড ট্রানজিট ভিসা প্রয়োজন হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে ভিসা ছাড়াই ট্রানজিটের সুযোগ থাকতে পারে। তাই প্রত্যেক যাত্রীর রুট ও নথি অনুযায়ী নিয়ম যাচাই করা জরুরি।
অন্যদিকে, যদি যুক্তরাজ্যের বর্ডার কন্ট্রোলের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিজিটর ইন ট্রানজিট ভিসা প্রয়োজন হতে পারে।
শেনজেন ভিসা থাকলে কি কোনো সুবিধা নেই?
শেনজেন ভিসা মূলত শেনজেন এলাকার দেশগুলোতে প্রবেশের জন্য প্রযোজ্য। এটি নিজে থেকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ বা ট্রানজিটের অনুমতি দেয় না। ফলে বাংলাদেশি কোনও যাত্রীর হাতে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন বা অন্য কোনও শেনজেন দেশের বৈধ ভিসা থাকলেও যুক্তরাজ্য হয়ে যাওয়ার সময় যুক্তরাজ্যের নিজস্ব ট্রানজিট নিয়ম মানতে হবে।
কিছু নির্দিষ্ট ভিসা বা নথি থাকলে যুক্তরাজ্যের ট্রানজিট ভিসার প্রয়োজন থেকে অব্যাহতি মিলতে পারে। যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড বা যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ ভিসার মতো নথি এ ধরনের ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে শুধু শেনজেন ভিসা থাকার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই ছাড় নিশ্চিত করে না।
টিকিট কাটার আগেই নিয়ম যাচাই করুন
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ভ্রমণের সময় সস্তা বা সুবিধাজনক সংযোগের জন্য অনেকেই লন্ডন হয়ে ফ্লাইট বেছে নিতে পারেন। কিন্তু টিকিটের দাম বা সংযোগের সময় দেখার পাশাপাশি ভিসার নিয়মও আগে যাচাই করা জরুরি।
যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এয়ারসাইড ট্রানজিট ভিসার প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে যাত্রীর জাতীয়তা ও তিনি কোনও নির্দিষ্ট ছাড়ের আওতায় পড়ছেন কি না, তার ওপর। তাই একই ধরনের রুট হলেও সব যাত্রীর ক্ষেত্রে নিয়ম এক নাও হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংযোগকারী ফ্লাইট নিশ্চিত থাকলেই ভিসার প্রয়োজনীয়তা উঠে যায় না। বিমানবন্দরে যাওয়ার আগেই নিজের পাসপোর্ট, গন্তব্য দেশের ভিসা, ফ্লাইটের রুট এবং যুক্তরাজ্যে ট্রানজিটের ধরন মিলিয়ে প্রয়োজনীয় অনুমতি আছে কি না নিশ্চিত করতে হবে।
ট্রানজিট ভিসার খরচও রয়েছে
বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডাইরেক্ট এয়ারসাইড ট্রানজিট ভিসার ফি ৪১ দশমিক ৫০ পাউন্ড, আর ভিজিটর ইন ট্রানজিট ভিসার ফি ৭৪ দশমিক ৫০ পাউন্ড। ফি পরিবর্তন হতে পারে এবং আবেদনকারীর অবস্থান অনুযায়ী সামান্য পার্থক্যও থাকতে পারে।
ভিসার আবেদন অনলাইনে করা যায়। সাধারণত ভিসা আবেদন কেন্দ্রে গিয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হয়। যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত পেতে সাধারণত প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তাই বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শেনজেন ভিসা আছে বলেই যুক্তরাজ্য হয়ে নিশ্চিন্তে ইউরোপ যাওয়া যাবে, এমনটা ধরে নিয়ে টিকিট বুক করবেন না। লন্ডন বা যুক্তরাজ্যের অন্য কোনও বিমানবন্দরকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে নিজের নির্দিষ্ট ভ্রমণপথ অনুযায়ী যুক্তরাজ্যের ট্রানজিট ভিসার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে নেওয়াই নিরাপদ। এতে বিমানবন্দরে বোর্ডিংয়ে জটিলতা, নতুন টিকিট কেনার প্রয়োজন বা অপ্রত্যাশিত অতিরিক্ত খরচের ঝুঁকি কমানো যায়।