ঢাকার কাছেই ইতিহাসের অন্যরকম ঠিকানা ধামরাইয়ের বণিক বাড়ি

ঢাকার ব্যস্ততা থেকে খুব বেশি দূরে না গিয়েও যদি পুরোনো স্থাপত্য, লোকজ সংস্কৃতি আর হারিয়ে যেতে বসা কারুশিল্পের স্বাদ নিতে চান, তাহলে ধামরাইয়ের বণিক বাড়ি হতে পারে ভিন্নধর্মী একটি স্থান। শতবর্ষী এই বাড়ি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতলের শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস।

ঢাকা থেকে ধামরাইয়ের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ধামরাইয়ের রথখোলা এলাকায় অবস্থিত বণিক বাড়িটি স্থানীয়ভাবে বণিক হাউস নামেও পরিচিত। বাড়িটির স্থাপত্যে পুরোনো দিনের ইন্দো-ইউরোপীয় প্রভাব চোখে পড়ে। দোতলা ভবনের সামনের অংশে পুরোনো নকশা, বারান্দা, অলংকৃত রেলিং এবং কাঠের দরজা-জানালা এখনো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাঁসা-পিতলের গল্প

বণিক বাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর স্থাপত্যের পাশাপাশি এখানকার কারুশিল্পের ঐতিহ্য। বণিক পরিবারের সঙ্গে কাঁসা-পিতলের কাজের সম্পর্ক কয়েক প্রজন্মের। ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রে এই পরিবারের কারুশিল্পের ধারাকে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

একসময় ধামরাই ছিল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ধাতব কারুশিল্পের কেন্দ্রগুলোর একটি। সরকারি ঐতিহ্যবিষয়ক তথ্যেও ধামরাইয়ের ধাতব শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা কারুশিল্পের কথা উল্লেখ রয়েছে। হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পের সঙ্গে বণিক বাড়ির সম্পর্ক জায়গাটিকে শুধু পুরোনো বাড়ি নয়, একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ করে তুলেছে।

বাড়ির ভেতরেই কারুশিল্পের জগৎ

বাড়িটির নিচতলায় কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন সামগ্রী ও শিল্পকর্ম তৈরির সঙ্গে যুক্ত কাজের জায়গা এবং প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের ধাতব মূর্তি, তৈজসপত্র ও শৌখিন সামগ্রী দেখা যায়। পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে ধাতব শিল্প তৈরির কাজ কাছ থেকে দেখার সুযোগও ভ্রমণটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

বিশেষ করে ধাতব মূর্তি তৈরিতে ব্যবহৃত লস্ট-ওয়াক্স পদ্ধতি ধামরাইয়ের কারুশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই পদ্ধতিতে মোমের ছাঁচ ব্যবহার করে ধাতব শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়। ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী শিল্পে এই কৌশলের ব্যবহার বহু পুরোনো বলে ঐতিহ্যবিষয়ক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থাপত্যের পাশাপাশি দেখুন শিল্পীদের কাজ

বণিক বাড়িতে গেলে শুধু ভবনের ছবি তুলে ফিরে না এসে কারুশিল্পের দিকটিও দেখার সুযোগ নিতে পারেন। ধাতব শিল্পীদের কাজ, তৈরি হওয়া বিভিন্ন সামগ্রী এবং পুরোনো স্থাপত্যসহ এখানে একসঙ্গে ধরা পড়ে ধামরাইয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস।

বাড়িটির সঙ্গে ধামরাইয়ের রথযাত্রার ঐতিহ্যেরও ভৌগোলিক যোগ রয়েছে। ধামরাই উপজেলা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখানকার রথ ও কাঁসা-পিতলের শিল্প দীর্ঘদিনের স্থানীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কখন যাবেন

শহরের কাছাকাছি হওয়ায় দিনের একটি অংশ দিয়েই ধামরাই ঘুরে দেখা সম্ভব। সকালে রওনা দিলে বণিক বাড়ির পাশাপাশি ধামরাইয়ের পুরোনো বাজার, স্থানীয় কারুশিল্পের দোকান এবং আশপাশের ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোও ঘুরে দেখার সুযোগ থাকবে।

বর্ষা বা শীতের নরম আলোয় পুরোনো ভবনের ছবি বেশ সুন্দর আসে। তবে কারুশিল্পের কর্মশালা বা বাড়ির ভেতরের অংশ দেখতে চাইলে আগে স্থানীয়ভাবে যোগাযোগ করে নেওয়া ভালো।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়কপথে ধামরাই যাওয়া যায়। ধামরাই ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসে ধামরাই পৌঁছে স্থানীয় যানবাহনে রথখোলা এলাকার বণিক বাড়ির দিকে যাওয়া যায়।

একদিনের ছোট ভ্রমণে যারা ইতিহাস, স্থাপত্য ও দেশীয় কারুশিল্প তিনটিই একসঙ্গে দেখতে চান, তাদের জন্য ধামরাইয়ের বণিক বাড়ি হতে পারে ঢাকার কাছের একটি ব্যতিক্রমী গন্তব্য।