গ্রিসের রাজধানী এথেন্স মানেই প্রাচীন স্থাপত্য, পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শন আর নীল সমুদ্র। তবে শহরটির আরেকটি পরিচয় এখন ধীরে ধীরে সামনে আসছে। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এথেন্স এখন আর শুধু ইতিহাস ও স্থাপত্য দেখার জায়গা নয়, খাবারের স্বাদ আবিষ্কারেরও আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে।
একসময় গ্রিক খাবার ছিল বেশ সাদামাটা। গ্রামের ঘরোয়া রান্না, শিমের ঝোল, শাকসবজি কিংবা স্থানীয় উপকরণে তৈরি সাধারণ পদই ছিল খাদ্যসংস্কৃতির মূল ভিত্তি। পর্যটকদের বড় অংশও এথেন্সে এসে প্রাচীন স্থাপনা ঘুরে দেখতেন, স্থানীয় খাবার খেতেন এবং এরপর গ্রিসের কোনও দ্বীপের উদ্দেশে চলে যেতেন। কিন্তু সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
এথেন্সের রাঁধুনিরা পুরনো গ্রিক রান্নাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। গ্রিসের রোদে পাকা টমেটো, স্থানীয় জলপাই, জলপাইয়ের তেল, ফেটা পনির, শাকসবজি ও নানা ধরনের শস্য ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন পদ। পুরনো স্বাদকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে তার সঙ্গে আধুনিক রান্নার ভাবনা যোগ করাই এখন এথেন্সের খাদ্যসংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শহরটিতে খাওয়াদাওয়ার পরিবেশও ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আলাদা করে তুলেছে। গ্রীষ্মে সমুদ্রের কাছাকাছি বসে খাবার খাওয়ার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনই শীতের রোদে শহরের রাস্তায় বসেও স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়। ফলে এথেন্স ঘুরতে গেলে দর্শনীয় স্থান দেখার পাশাপাশি খাবারের জগতটিও ভ্রমণসূচিতে জায়গা করে নিচ্ছে।
তবে এথেন্সের খাবারের নতুন স্বাদ পেতে পর্যটকদের এখন আর শুধু বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানের আশপাশে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে না। শহরের অপেক্ষাকৃত সাধারণ পাড়াগুলোতেও গড়ে উঠেছে নানা খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ। পেত্রালোনা, কেরামাইকোস কিংবা কিপসেলির মতো এলাকায় গেলে পর্যটকেরা স্থানীয় জীবনযাত্রার কাছাকাছি থেকে খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এথেন্সের খাবারের বৈচিত্র্য আরও বেড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের রান্নার উপস্থিতিতে। এশিয়া, আফ্রিকা, বলকান অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের খাবার পরিবেশনকারী রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে একই শহরে গ্রিক খাবারের পাশাপাশি নানা দেশের রান্নার স্বাদও পাওয়া যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে এথেন্সের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসেরও প্রভাব রয়েছে। গত শতকের আশির দশকে শহরের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। গ্রামীণ জীবন ও পুরনো খাদ্যসংস্কৃতির জায়গায় ধীরে ধীরে দ্রুত প্রস্তুত খাবার এবং বেশি মাংস খাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। নব্বইয়ের দশকে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি খাবারের প্রতিও আগ্রহ বাড়ে।
এরপর ২০০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকট এথেন্সের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনে। দীর্ঘ সময় ধরে বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটের মধ্যে অনেক মানুষ নতুন করে নিজেদের শিকড়ের দিকে তাকান। কেউ বাবা-মা বা দাদা-দাদির সঙ্গে থাকতে শুরু করেন, কেউ ফিরে যান পূর্বপুরুষের গ্রামে। পরিবারের জলপাইবাগান, আঙুরের বাগান ও কৃষিকাজও নতুন করে গুরুত্ব পেতে থাকে।
এই সময় খাদ্য নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তাও শুরু হয়। মৌসুমি খাবার খাওয়া, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি খাদ্যসামগ্রী কেনা এবং স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ে। পুরনো দিনের ঘরোয়া রান্নার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় নতুন প্রজন্মের মধ্যেও। দিদা-ঠাকুমাদের রান্নাঘর থেকে হারিয়ে যেতে বসা নানা পদ আবার ফিরে আসে নতুন রূপে।
গ্রিক খাদ্যসংস্কৃতির এই পরিবর্তনকে শুধু অতীতে ফিরে যাওয়া বলা যায় না। বরং পুরনো রান্নার সঙ্গে নতুন চিন্তা ও উপস্থাপনার সমন্বয় ঘটছে। ঐতিহ্যকে স্থির কোনো বিষয় হিসেবে না দেখে তার ওপর ভিত্তি করে নতুন স্বাদ তৈরি করছেন এথেন্সের রাঁধুনিরা।
এ কারণে শহরের খাবারের জগতে এখন একদিকে যেমন সাধারণ ও ঘরোয়া রান্নার জনপ্রিয়তা রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে উচ্চমানের রেস্তোরাঁ। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে সেখানে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের অভিনব পদ। পরিচিত ছোলা, বুনো শাক কিংবা অন্যান্য সাধারণ উপকরণও নতুনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে।
শুধু গ্রিক রান্নাই নয়, এথেন্সে এখন বিভিন্ন দেশের খাবারের সঙ্গে গ্রিক স্বাদের মেলবন্ধনও দেখা যাচ্ছে। জাপানি ও গ্রিক রান্নার সংমিশ্রণ, তিলের পেস্ট দিয়ে তৈরি নুডলস, ইথিওপিয়ার মাংসের ঝোল, জর্জিয়ার পনিরভরা রুটি কিংবা লেবাননের সালাদের মতো খাবারও শহরের খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
তাই এথেন্স ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে শুধু প্রাচীন স্থাপনা আর সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখেই ফিরে আসার প্রয়োজন নেই। শহরের অলিগলি, স্থানীয় বাজার এবং ছোট রেস্তোরাঁয় ঘুরে গ্রিসের বদলে যাওয়া খাবারের সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়া যায়। ইতিহাসের শহর এথেন্স এখন তার পুরনো স্বাদকে সঙ্গে নিয়েই নতুন এক খাদ্যভ্রমণের দরজা খুলে দিয়েছে।