ঢেউয়ের আঘাতে প্রকৃতির কাছে হার মানলো ৫৫০ বছরের পুরোনো প্রাকৃতিক বিস্ময়

প্রকৃতির সৃষ্টি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, আবার সময়ের সঙ্গে তার রূপ কীভাবে বদলে যেতে পারে হাওয়াইয়ের হোলেই সমুদ্র খিলান ছিল তার এক অনন্য উদাহরণ। প্রায় ৫৫০ বছর ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ ও বাতাসের ক্ষয় সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা ২৭ মিটার উঁচু এই প্রাকৃতিক খিলান অবশেষে ধসে পড়েছে। হারিয়ে গেছে হাওয়াইয়ের উপকূলের অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

হাওয়াইয়ের বিগ আইল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে হাওয়াই আগ্নেয়গিরি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ছিল হোলেই সমুদ্র খিলান। আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে তৈরি পাথরের ওপর দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার ফলে ধীরে ধীরে ক্ষয় সৃষ্টি হয়। অপেক্ষাকৃত নরম অংশগুলো দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাওয়ার পর পাথরের ভেতরে তৈরি হয় গুহার মতো ফাঁকা স্থান। সময়ের সঙ্গে সেই ফাঁকা অংশ বড় হয়ে রূপ নেয় বিশাল প্রাকৃতিক খিলানে।

প্রায় ৫৫০ বছর আগে প্রবাহিত লাভা থেকে তৈরি হয়েছিল খিলানটির পাথর। এরপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতির নানা শক্তির সঙ্গে লড়াই করে এটি দাঁড়িয়ে ছিল। কপোতাক্ষের মতো শান্ত নদীতীরের দৃশ্য নয়, বরং এখানে ছিল বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর, কালো আগ্নেয়শিলা আর সমুদ্রের অবিরাম ঢেউ—যা জায়গাটিকে করে তুলেছিল অনন্য।

হোলেই সমুদ্র খিলান ছিল পর্যটকদের কাছেও বেশ আকর্ষণীয়। হাওয়াইয়ের আগ্নেয়ভূমি, সমুদ্র আর খাড়া পাথুরে উপকূলের মিলিত দৃশ্যের মধ্যে এই খিলান ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। দূর থেকে বিশাল পাথরের খিলানের নিচ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো।

তবে বহু বছর ধরেই খিলানটির দুর্বল হয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। ২০১৮ সালে কিলাউয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও চূড়ার ধসের সময় ওই উপকূলীয় এলাকায় ভূমিকম্প হয়। এতে আশপাশের পাহাড় ও পাথুরে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে খিলানের আশপাশেও ফাটল ও অস্থিতিশীলতার চিহ্ন দেখা দিতে থাকে।

নিরাপত্তার কারণে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে খিলান দেখার পুরোনো দর্শনস্থান বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই বছরের মার্চে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে নতুন দর্শনস্থান তৈরি করা হয়। সেখান থেকে পর্যটকদের নিরাপদ দূরত্বে রেখে খিলানটি দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।

২০২২ সালের জুলাইয়ে হাওয়াইয়ের দক্ষিণ উপকূলে শক্তিশালী ঢেউ আঘাত হানলে খিলানের একটি স্তম্ভের নিচের অংশ থেকে বড় একটি পাথরের খণ্ড ভেঙে পড়ে। এরপর কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানায়, হোলেই সমুদ্র খিলান যেকোনো সময় এবং কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই ধসে পড়তে পারে। তারপরও আরও কয়েক বছর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে দাঁড়িয়ে ছিল এটি।

জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খিলানটি অক্ষত ছিল। এর কয়েক দিন পর হাওয়াই দ্বীপের ওপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড় নোলো বয়ে যায়। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ সেপ্টেম্বরের ভোর পর্যন্ত জাতীয় উদ্যানের বড় একটি অংশ বন্ধ ছিল।

পার্কটি আবার খুলে দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, হোলেই সমুদ্র খিলানটি আর সেখানে নেই। পরে ১ অক্টোবর জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ এর ধসে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। ঠিক কখন খিলানটি ভেঙে পড়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও ২৭ সেপ্টেম্বর রাতের মধ্যেই এটি ধসে পড়েছিল বলে জানানো হয়।

হাওয়াইয়ের দক্ষিণ উপকূলে এমন আরও প্রাকৃতিক সমুদ্র খিলান রয়েছে। তবে প্রতিটি খিলানই প্রকৃতির ক্ষয়প্রক্রিয়ার কাছে সাময়িক। পাথরের যে অংশগুলো তাদের ধরে রাখে, সেগুলো একসময় এতটাই দুর্বল হয়ে যায় যে পুরো কাঠামো আর টিকে থাকতে পারে না।

হোলেই সমুদ্র খিলানের পতন তাই শুধু একটি পর্যটন আকর্ষণ হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি প্রকৃতির পরিবর্তনশীল শক্তিরও এক অনন্য স্মারক। শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পাথুরে খিলান আজ নেই, কিন্তু তার জায়গায় রয়ে গেছে প্রশান্ত মহাসাগর, আগ্নেয়শিলার উপকূল আর প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে বদলে যাওয়া এক ভূদৃশ্য।