স্পেনের ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র ও সমুদ্রসৈকত থেকে দূরে এক্সত্রেমাদুরা এবং কাস্তিয়া ই লেওন অঞ্চল এখন ভিন্নধর্মী ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। কম জনসংখ্যা, কম আলোকদূষণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণীর কারণে স্পেনের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল পরিচিত ‘লা এস্পানিয়া ভাসিয়া’, অর্থাৎ ‘জনশূন্য স্পেন’ নামে।
দেশটির জনপ্রিয় পর্যটন শহরগুলোর তুলনায় এই অঞ্চলে পর্যটকের চাপও অনেক কম। ফলে প্রকৃতি ও নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করতে আগ্রহী ভ্রমণকারীদের জন্য এটি হয়ে উঠছে আকর্ষনীয় স্থান। বিশেষ করে রাতের আকাশ দেখার জন্য অঞ্চলটির বেশ কয়েকটি স্থান ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে।
অ্যাস্ট্রোট্যুরিজম বা জ্যোতির্বিষয়ক পর্যটনের আওতায় লা সিবেরিয়া ও কোরাল দে লস লোবোসের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় পর্যটকেরা যাচ্ছেন। এসব এলাকায় আলোকদূষণ খুব কম থাকায় পরিষ্কার রাতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস), বৃহস্পতি এবং মিল্কি ওয়ে দেখা যায়।
লা সিবেরিয়ার নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এর দুর্গমতার ইতিহাস। একসময় এখানকার সড়ক ও রেলপথ নির্মাণে কাজ করা শ্রমিকদের কাছে অঞ্চলটি এতটাই প্রত্যন্ত মনে হয়েছিল যে, তারা এর নাম দেন সাইবেরিয়ার আদলে ‘লা সিবেরিয়া’।
কোরাল দে লস লোবোসও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ের চূড়ায় থাকা প্রাচীন পাথরের এই ঘের একসময় নেকড়ে ধরার জন্য ব্যবহার করা হতো।
‘জনশূন্য স্পেন’-এর অন্যতম বড় আকর্ষণ এর বন্যপ্রাণী। মঁফ্রাগুয়ে ন্যাশনাল পার্কে কয়েক দশক আগের বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া অবস্থার পর আইবেরীয় লিংক্সের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
পাশের গ্রেদোস পর্বতমালায়ও আইবেরীয় নেকড়ের ফিরে আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিন শিকার ও আবাসস্থল হারানোর কারণে এই প্রাণী প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। সংরক্ষণ ও সুরক্ষার উদ্যোগের ফলে এখন তাদের বিচরণ আবার বাড়ছে।
এ ছাড়া স্প্যানিশ ইম্পেরিয়াল ঈগলের সংখ্যাও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। গ্রিফন শকুন ও মধুখেকো বাজসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য গারগান্তা দে লস ইনফিয়েরনোস প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকাও আকর্ষণীয়। এখানে জের্তে নদী, গ্রানাইট পাথরের প্রাকৃতিক জলাধার এবং ঘন সবুজ বন রয়েছে। পাথরের গায়ে জন্মানো লাইকেনও এখানকার পরিষ্কার পরিবেশের একটি প্রাকৃতিক নির্দেশক হিসাবে বিবেচিত হয়।
এ অঞ্চলে ভ্রমণকারীদের কাছে স্থানীয় খাবারও গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। চেরি, জলপাই, ডুমুর, পাপরিকা, চিজ, আলু ও স্থানীয় মাশরুমের পাশাপাশি পাওয়া যায় রুফেতে আঙুরের তৈরি ওয়াইন। দেহেসা বনাঞ্চলে অ্যাকর্ন খেয়ে বেড়ে ওঠা কালো শূকরের মাংস থেকে তৈরি হয় বিশ্বখ্যাত জামোন ইবেরিকো।
স্থানীয় খাবারের দামও স্পেনের ব্যস্ত পর্যটন এলাকাগুলোর তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে কম। ফলে প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি স্থানীয় খাবার উপভোগ করতেও এই অঞ্চল পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।
তবে ‘জনশূন্য স্পেন’-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা এর জনসংখ্যা কমে যাওয়া। ভালভার্দে দে লা ভেরার মতো অনেক শহর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার বাসিন্দা হারিয়েছে। কোথাও কোথাও রয়েছে মাত্র কয়েকটি তাপাস বার ও অতিথিশালা, এমনকি হোটেলও নেই।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই অঞ্চলে পড়ছে। ২০২৫ সালের তীব্র তাপপ্রবাহজনিত দাবানলে জের্তে উপত্যকার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর চেরি বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চেরি মৌসুম এই অঞ্চলে পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম প্রধান উপলক্ষ হওয়ায় এর প্রভাব স্থানীয় পর্যটন ও অর্থনীতিতেও পড়েছে।
এই অঞ্চলে ভ্রমণের সময় কাসেরেস, ত্রুহিয়ো ও প্লাসেন্সিয়া ভালো ঘাঁটি হিসাবে বিবেচিত হয়। পর্যটকেরা স্পেনের রাষ্ট্রীয় প্যারাদোর নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত পুরোনো কনভেন্ট, প্রাসাদ ও ঐতিহাসিক ভবনে তৈরি আবাসনেও থাকতে পারেন।
যারা প্রকৃতি ও তারাভরা রাত উপভোগ করতে চান, এমন পর্যটকদের জন্য স্পেনের এই অঞ্চলগুলো ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।