মাটি-বাঁশের অনন্য স্থাপত্যে গড়া দীপশিখা মেটি স্কুল

ইট-কংক্রিটের পরিচিত ভবনের বাইরে মাটি, বাঁশ আর খড় দিয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন একটি বিদ্যালয়। চারপাশে গ্রামীণ পরিবেশ, নির্মাণশৈলীতে স্থানীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া। দিনাজপুরের দীপশিখা মেটি স্কুল যেন স্থাপত্য ও শিক্ষার এক ব্যতিক্রমী ঠিকানা। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবেই নয়, পরিবেশবান্ধব নির্মাণশৈলী দেখতে এবং বাংলাদেশের গ্রামীণ স্থাপত্যের ভিন্ন রূপ চিনতে আগ্রহী ভ্রমণপিপাসুদের কাছেও জায়গাটি আকর্ষণীয়।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রুদ্রপুর গ্রামে অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি দেখিয়ে দেয়, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করেও কীভাবে নান্দনিক ও কার্যকর ভবন নির্মাণ করা যায়। তাই দিনাজপুর ভ্রমণের পরিকল্পনায় ঐতিহাসিক স্থাপনা বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই স্কুলটিকেও রাখতে পারেন।

মাটি, বাঁশ, খড়সহ স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি এই স্কুল (ছবি: সংগৃহীত)

মাটি, বাঁশ আর খড়ের নান্দনিক স্থাপত্য

দীপশিখা মেটি স্কুলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর নির্মাণশৈলী। ভবন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে মাটি, বাঁশ, খড়সহ স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য বিভিন্ন উপকরণ। দোতলা ভবনের নকশায় এমনভাবে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ আরামদায়ক থাকে এবং কৃত্রিম আলোর ওপর নির্ভরতা কমে।

বিদ্যালয়টির বর্তমান ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০০৫ সালে, শেষ হয় ২০০৬ সালে। পরিবেশবান্ধব ও ব্যতিক্রমী স্থাপত্যের স্বীকৃতি হিসাবে ২০০৭ সালে এটি আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার অর্জন করে। স্থানীয় উপকরণ ও ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত এই ভবন বাংলাদেশের টেকসই স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

মাটির দোতলা ভবনের নকশা (ছবি: সংগৃহীত)

শিক্ষার সঙ্গে স্থানীয় ঐতিহ্য

দীপশিখা নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করে। রুদ্রপুর ও আশপাশের এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। আনন্দের মাধ্যমে শেখা, হাতে-কলমে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এখানে।

বিদ্যালয়টির নকশায় স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন রয়েছে। ফলে এখানে বেড়াতে গেলে শুধু একটি ভবন দেখা নয়, গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে মানানসই স্থাপত্য ও শিক্ষার ভিন্নধর্মী ধারণা সম্পর্কেও জানার সুযোগ মেলে।

মাটির ছোট ছোট কামরায় শিক্ষার্থীরা শুয়ে বসে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে (ছবি: সংগৃহীত)

কীভাবে যাবেন?

দিনাজপুর শহর থেকে দীপশিখা মেটি স্কুলের দূরত্ব আনুমানিক ২২–২৫ কিলোমিটার। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নাবিল, হানিফ, শ্যামলি, এসআরসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার বাসে সেখানে যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে দিনাজপুরের বাসভাড়া ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে। ট্রেনেও দিনাজপুর শহরে যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস, পঞ্জগড় এক্সপ্রেস টেন রয়েছে। ট্রেনের ভাড়া ৪৯৫ থেকে শুরু। বাস বা ট্রেনে দিনাজপুর শহরে পৌঁছে সেখান থেকে স্থানীয় যানবাহনে বিরল উপজেলার রুদ্রপুর গ্রামের দিকে যেতে পারেন। সেখান থেকে মঙ্গলপুর এলাকায় নেমে অটোরিকশা বা স্থানীয় যানবাহনে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ রয়েছে।

ব্যতিক্রমী স্থাপত্যের স্বীকৃতি হিসাবে ২০০৭ সালে এটি আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার অর্জন করে (ছবি: সংগৃহীত)

দিনাজপুর ভ্রমণে ভিন্নধর্মী এক গন্তব্য

দিনাজপুরের ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা দিঘি দেখার পাশাপাশি দীপশিখা মেটি স্কুলের মতো জায়গা ভ্রমণকে দিতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা। এখানে স্থাপত্য, শিক্ষা, স্থানীয় ঐতিহ্য ও পরিবেশবান্ধব জীবনধারণের ধারণা একসঙ্গে মিশে আছে। যারা প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু দেখতে চান, তাদের দিনাজপুর ভ্রমণতালিকায় এই বিদ্যালয়টি রাখতে পারেন।