যেখানে বেঁচে থাকাই চ্যালেঞ্জ, সেই দক্ষিণ মেরুতে পর্যটকেরা কীভাবে পৌঁছান?

চারদিকে যত দূর চোখ যায়, শুধু বরফ আর বরফ। মাথার ওপর উজ্জ্বল সূর্য, অথচ হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় বাইরে বেরোনোই কঠিন। নেই গাছপালা, নেই জনবসতি, এমনকি সাধারণ পর্যটনকেন্দ্রের মতো প্রাণচাঞ্চল্যও। পৃথিবীর এমনই এক দুর্গম অঞ্চল অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরু। বরফে ঢাকা এই রহস্যময় ভূখণ্ডের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে বহু ভ্রমণপিপাসুর। কিন্তু সেখানে যাওয়া কি সত্যিই সম্ভব? কীভাবে পৌঁছাতে হয় পৃথিবীর এই শীতল প্রান্তে?

দক্ষিণ মেরুর পরিবেশ সাধারণ শীতের দেশের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নীচে নেমে যেতে পারে। দিগন্তজোড়া বরফের চাদরে ঢাকা এই অঞ্চলে গাছপালা কিংবা পোকামাকড়ের দেখা মেলে না বললেই চলে। ফলে তুষারাবৃত পাহাড়, সবুজ বন কিংবা বন্যপ্রাণীর সান্নিধ্যে ছুটি কাটানোর প্রচলিত ধারণার সঙ্গে দক্ষিণ মেরুর অভিজ্ঞতার তেমন মিল নেই। এখানে প্রকৃতির বিশালতা আর চরম প্রতিকূলতাই ভ্রমণের মূল আকর্ষণ।

দক্ষিণ মেরুতে কি পেঙ্গুইন দেখা যায়?

অ্যান্টার্কটিকা বললেই অনেকের মনে প্রথমে আসে পেঙ্গুইনের ছবি। কিন্তু দক্ষিণ মেরুর অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে গেলে পেঙ্গুইন দেখার সুযোগ নেই। এম্পেরর পেঙ্গুইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির পেঙ্গুইন মূলত সমুদ্রের কাছাকাছি উপকূলীয় এলাকায় থাকে। তাই পেঙ্গুইন দেখার ইচ্ছা থাকলে অ্যান্টার্কটিকার উপকূলবর্তী অঞ্চল ভ্রমণের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছানোর অভিযান আর উপকূলে বন্যপ্রাণী দেখার সফর দুটি অভিজ্ঞতা এক নয়।

ছয় মাস দিন, ছয় মাস রাত!

দক্ষিণ মেরুর প্রকৃতি যেমন বিস্ময়কর, তেমনই সেখানকার সময়ের হিসাবও অন্য রকম। পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থানের কারণে এখানে বছরে প্রায় ছয় মাস সূর্য দিগন্তের ওপরে থাকে, আর বাকি ছয় মাস সূর্য দিগন্তের নীচে থাকে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে আলো কিংবা অন্ধকারের মধ্যে থাকতে হয়। এই পরিবেশে কাজ করা গবেষক ও কর্মীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা তাই বিশেষভাবে পরিকল্পিত। খাবার, আশ্রয়, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছাড়া সেখানে দীর্ঘদিন থাকা কঠিন।

বরফের মধ্যে থেকেও কেন শুষ্ক এই অঞ্চল?

অ্যান্টার্কটিকার বিস্তীর্ণ অংশ বরফে ঢাকা থাকলেও মহাদেশটির অভ্যন্তর অত্যন্ত শুষ্ক। সেখানে বৃষ্টিপাত ও নতুন তুষারপাতের পরিমাণ অনেক জায়গায় খুবই কম। বাতাসে আর্দ্রতার স্বল্পতা এবং অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রার কারণে এই অঞ্চলকে পৃথিবীর শীতলতম মরুভূমিগুলির অন্যতম বলা হয়। বরফের বিশাল স্তর দেখলে যে ধারণা তৈরি হয়, বাস্তবে সেখানকার আবহাওয়া তার চেয়েও অনেক বেশি কঠোর।

কীভাবে পৌঁছাবেন দক্ষিণ মেরুতে?

অ্যান্টার্কটিকার উপকূল ও অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলায় পর্যটকেরা সাধারণত জাহাজে করে পৌঁছান। কিন্তু মহাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত দক্ষিণ মেরুতে যেতে হলে প্রয়োজন আলাদা ব্যবস্থা। একটি প্রচলিত পথ হল চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে বিমানে যাত্রা করে ইউনিয়ন গ্লেসিয়ার ক্যাম্পে পৌঁছানো। সেখান থেকে আবহাওয়া ও যাত্রার পরিস্থিতি অনুযায়ী দক্ষিণ মেরুর দিকে এগোনোর ব্যবস্থা করা হয়।

কেউ কেউ ইউনিয়ন গ্লেসিয়ার ক্যাম্প থেকে স্কি করে বরফের ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অভিযানেও অংশ নেন। তবে এটি সাধারণ বেড়ানোর মতো নয়। এমন যাত্রায় প্রয়োজন শারীরিক প্রস্তুতি, উপযুক্ত পোশাক, বিশেষ সরঞ্জাম এবং অভিজ্ঞ গাইডের সাহায্য। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যাত্রার সময়সূচি বদলে যেতে পারে। তাই পরিকল্পনায় নমনীয়তা রাখা জরুরি।

সেখানে কি মানুষ থাকেন?

চারপাশে জনমানবহীন বরফের প্রান্তর দেখে মনে হতে পারে, এখানে মানুষের পক্ষে থাকা অসম্ভব। কিন্তু দক্ষিণ মেরুতে গবেষণা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য মানুষ থাকেন। একটি ভিডিওতে ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা জেন জিবেল ২০২৩ সালে দক্ষিণ মেরুতে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর প্রকাশিত ফুটেজে দেখা যায়, উজ্জ্বল সূর্যের নীচে বরফে ঢাকা বিস্তীর্ণ অঞ্চল। কিন্তু আশপাশে কোনও মানুষ বা প্রাণীর দেখা নেই। ভিডিওর ক্যাপশনেও সেই নির্জনতার কথা উঠে এসেছে।

এমন দুর্গম পরিবেশে কাজ করতে প্রয়োজনীয় খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য সামগ্রী বিমানে করে নিয়ে যেতে হয়। সব কিছুই নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবহার করতে হয়। সাধারণত প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের দল বিচ্ছিন্ন পরিবেশে কাজ করেন বলে ওই বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও বাইরের পৃথিবী থেকে দূরত্বের কারণে তাঁদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভ্রমণের আগে কী কী মাথায় রাখবেন?

অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের জন্য আগেভাগে পরিকল্পনা করা জরুরি। প্রয়োজনীয় অনুমতি, যাত্রাপথ, আবহাওয়ার পরিস্থিতি, নিরাপত্তা এবং থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য ট্যুর অপারেটরের সাহায্য নিলে নিয়মকানুন ও যাত্রার প্রস্তুতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ পোশাক এবং ঠান্ডা থেকে সুরক্ষার উপকরণও এই সফরের অপরিহার্য অংশ।

দক্ষিণ মেরুতে ভ্রমণ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। তবে সেখানে যাওয়ার আকর্ষণ শুধু বরফের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির চরম পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হওয়াও এই অভিযানের অংশ। তাই বরফের দেশে পা রাখার স্বপ্ন দেখলে রোমাঞ্চের পাশাপাশি বাস্তবতা, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।