পাহাড়ের গায়ে মেঘের আনাগোনা, ঘন সবুজের মাঝে ঝরনার জলধারা, আর চুনাপাথরের পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় গুহা- প্রকৃতির এমনই নানা রূপে মুগ্ধ হলেন ভারতে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত মে-এলিন স্টেনার। সপ্তাহান্তে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেঘালয় ঘুরে দেখেছেন তিনি। সেই ভ্রমণের ছবি সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের এই রাজ্যের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
মেঘালয়ের রাজধানী শিলং এবং তার আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল বহু দিন ধরেই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে শহরের পরিচিত গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রকৃতির আরও নিবিড় সান্নিধ্য পেতে চাইলে ঘুরে দেখতে পারেন সোরা বা চেরাপুঞ্জির আশপাশের জলপ্রপাত ও গুহা। স্টেনারের ভ্রমণতালিকাতেও ছিল ওয়েই সওডং জলপ্রপাত এবং আরওয়া গুহার মতো আকর্ষণীয় জায়গা।
সমাজমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, নরওয়ে থেকে আসা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিলংয়ে স্মরণীয় একটি সপ্তাহান্ত কাটিয়েছেন তিনি। জলপ্রপাত, গুহা এবং সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে মেঘালয়ের সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছেন। তাঁর মতে, এই রাজ্যের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ভারতের সমৃদ্ধির এক অসাধারণ পরিচয় তুলে ধরে।
তিন ধাপে নেমে এসেছে ওয়েই সওডংয়ের জল
মেঘালয়ের জলপ্রপাতের কথা উঠলে ওয়েই সওডংয়ের নাম আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়। অন্য অনেক জলপ্রপাতের তুলনায় এর বিশেষত্ব হল, জল এখানে তিনটি পৃথক ধাপে নীচে নেমে আসে। গাঢ় রঙের পাথরের মাঝে তৈরি হয়েছে জলকুণ্ড, যার নীলচে-সবুজ জল দূর থেকেই নজর কাড়ে। চারপাশের ঘন সবুজের সঙ্গে জলের এই রঙের বৈপরীত্য জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
শিলং থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই জলপ্রপাতের কাছেই রয়েছে ডেনথলেন জলপ্রপাত। ফলে সোরা ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে একই সফরে দু’টি জলপ্রপাত ঘুরে দেখতে পারেন। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর পাশাপাশি ছবি তোলার জন্যও জায়গাগুলি বেশ আকর্ষণীয়।
তবে ওয়েই সওডংয়ে পৌঁছনো খুব সহজ নয়। জলপ্রপাতের কাছে যেতে খাড়া পথ ধরে নীচে নামতে হয়, আর ফেরার সময় সেই পথ বেয়েই উঠতে হয় ওপরে। পরিশ্রমের বদলে অবশ্য মেলে তিনটি ধাপে নেমে আসা জলধারা এবং তার নীচে তৈরি হওয়া স্বচ্ছ জলকুণ্ডের কাছ থেকে সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ।
চুনাপাথরের পাহাড়ের ভেতরে আরওয়া গুহার রহস্য
জলপ্রপাতের সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি সোরা ভ্রমণে আরওয়া গুহাও রাখতে পারেন তালিকায়। ক্রেম আরওয়া নামেও পরিচিত এই গুহার পরিবেশ জলপ্রপাতের থেকে একেবারেই আলাদা। খোলা পাহাড়ি প্রান্তর পেরিয়ে চুনাপাথরের পাহাড়ের ভেতরে এগিয়ে গিয়েছে সরু পথ। গুহার ভেতরে প্রবেশ করলে চোখের সামনে খুলে যায় প্রকৃতির গড়ে তোলা এক বিস্ময়কর জগৎ।
জীবাশ্মের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এই গুহা। চুনাপাথরের দেওয়ালে সংরক্ষিত অবস্থায় দেখা যায় খোলসযুক্ত জলজ প্রাণীর অবশেষ এবং মাছের হাড়ের জীবাশ্ম। এগুলি এই অঞ্চলের প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের নানা ইঙ্গিত বহন করে।
গুহার ভেতরে রয়েছে আরও এক বিস্ময়। ছাদ থেকে নীচের দিকে ঝুলে থাকা স্ট্যাল্যাকটাইট এবং মাটি থেকে ওপরের দিকে উঠে আসা স্ট্যাল্যাগমাইট। খনিজসমৃদ্ধ জল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে চুনাপাথরের স্তর জমে এই প্রাকৃতিক গঠনগুলি তৈরি হয়। হাজার হাজার বছরের প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা এই গঠনগুলি দেখলে প্রকৃতির ধীর অথচ বিস্ময়কর সৃষ্টিশীলতার পরিচয় মেলে।
মেঘালয় ভ্রমণে কেন রাখবেন এই জায়গাগুলি?
পাহাড়ি পথ, জলপ্রপাত, গুহা এবং সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশের সমাহার এই রাজ্যকে অন্য রকম ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দেয়। বিশেষত সোরা অঞ্চলে একই সফরে জলপ্রপাতের সৌন্দর্য এবং চুনাপাথরের গুহার রহস্য উপভোগ করা যায়।
তবে বর্ষা বা বৃষ্টির সময়ে পাহাড়ি পথের অবস্থা সম্পর্কে আগে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। পরিকল্পনা করে এগোলে মেঘালয়ের এই অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি প্রাকৃতিক গন্তব্যগুলি ভ্রমণের স্মৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে।