ভারতীয় পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় দ্রুত উপরের দিকে উঠে আসছে জাপান। ভারত থেকে দেশটিতে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় প্রতি বছর দ্বিগুণ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সেবা প্রদানকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ভিএফএস গ্লোবালের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জুবিন কারকারিয়া। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ক্রমশ সহজলভ্য হয়ে ওঠা, মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির অগ্রগতি সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে ভ্রমণের ধরন।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিট ২০২৬-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে কারকারিয়া ভারতীয় পর্যটকদের পছন্দ, বিশ্ব পর্যটনে ভারতের গুরুত্ব এবং ভবিষ্যতে বিমানবন্দর ও সীমান্ত পারাপারের প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় পর্যটকদের কাছে জাপানের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কারকারিয়ার মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটনে ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে এমন দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। পাঁচ বছর আগের তুলনায় দেশটিতে ভ্রমণ এখন তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় ভারতীয়দের আগ্রহও বাড়ছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে জাপানে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় প্রতি বছর দ্বিগুণ হচ্ছে। ভ্রমণ ব্যয়ের পরিবর্তন এবং দেশটির প্রতি পর্যটকদের বাড়তি আগ্রহ এই প্রবণতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণে মানুষের অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে তাঁদের পছন্দও। কারকারিয়ার মতে, প্রথমবার বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকেরা সাধারণত ট্যুর অপারেটরের আয়োজিত প্যাকেজ বেছে নেন। তাঁদের লক্ষ্য থাকে সীমিত সময়ে যতটা সম্ভব বেশি জায়গা ঘুরে দেখা। যেমন, ১৪ দিনের সফরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করেন অনেকে।
তবে একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হওয়ার পর অনেক পর্যটক নির্দিষ্ট আগ্রহকে কেন্দ্র করে সফরের পরিকল্পনা করেন। কেউ স্থানীয় খাবার ও রন্ধনশৈলী সম্পর্কে জানতে চান, কারও আগ্রহ শিল্পকলায়, আবার কেউ কোনো দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কাছ থেকে অনুভব করতে চান।
অর্থাৎ, অভিজ্ঞ পর্যটকদের কাছে ভ্রমণের সময় কতগুলো জায়গা দেখা হলো, তার পাশাপাশি কোনও স্থানের বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ভিএফএস গ্লোবালের অন্যতম বৃহৎ বাজার ভারত। কারকারিয়া দেশটির তরুণ জনগোষ্ঠী, দক্ষ জনশক্তির ক্রমবর্ধমান পরিসর এবং মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে ভারতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন।
বিশ্বজুড়ে দক্ষ কর্মীর চাহিদাও বাড়ছে। কারকারিয়ার অনুমান, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। ভারতের তরুণ কর্মশক্তি, উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যটকদের উৎস হিসেবেও ভারতের গুরুত্ব বাড়ছে। কারকারিয়ার মতে, বিদেশ ভ্রমণ পর্যটনের বাইরেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি, বিদেশে পড়াশোনা ও নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও বাড়ায়।
কারকারিয়া জানান, ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) পর্যটন সম্মেলন ২০২৭ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে। ভারতকে বেছে নেওয়ার আগে সংস্থাটি আরও ২২টি দেশ ও স্থান বিবেচনা করেছিল।
এই সম্মেলন আয়োজনের সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় পর্যটন ও সংস্কৃতিমন্ত্রীর প্রচেষ্টার কথাও তুলে ধরেন কারকারিয়া। আন্তর্জাতিক পর্যটন ও ভ্রমণশিল্পে ভারতের গুরুত্বের প্রতিফলন হিসেবেও এই আয়োজনকে দেখা যেতে পারে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিতে বিমানবন্দর এবং অভিবাসনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা আরও দ্রুত ও নির্বিঘ্ন হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ উঠে যাবে- এমনটা মনে করেন না কারকারিয়া।
তাঁর মতে, ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সাহায্য করে। তবে এ সুবিধা পেতে গন্তব্য দেশেও পাসপোর্ট যাচাইয়ের উপযোগী প্রযুক্তি থাকতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। ভিসার আবেদন করার সময় ভ্রমণকারীর আঙুলের ছাপ নেওয়া হতে পারে, যা গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর আবার যাচাই করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে বলে আশা করছেন কারকারিয়া।
উদাহরণ হিসেবে তিনি দুবাই বিমানবন্দরের স্মার্ট টানেলের কথা উল্লেখ করেন। এই ব্যবস্থায় যোগ্য ভ্রমণকারীরা নির্দিষ্ট পর্যায়ে পাসপোর্ট বা বোর্ডিং পাস বের না করেই টানেল দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন।
তবে দ্রুত যাচাইপ্রক্রিয়ার অর্থ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ উঠে যাওয়া নয়। কারকারিয়ার কথায়, “সীমান্তহীন ব্যবস্থা কি হবে? না, দুর্ভাগ্যবশত তা হবে না।”
প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছন্দ করতে পারে, তবে সীমান্তে পরিচয় যাচাই ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থেকেই যাবে।
সূত্র: এনডিটিভি