ভাবুন, ইতালিতে ট্রেনে চড়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ দেখলেন, চলন্ত ট্রেনটি উঠে যাচ্ছে বিশাল এক জাহাজের ভেতরে! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ইতালির ট্রেনিতালিয়া ইন্টারসিটি নোত্তে পরিষেবায় এমন অভিজ্ঞতার সুযোগ রয়েছে। মেসিনা প্রণালি পার হতে এই ট্রেনকে ফেরিতে তোলা হয়। এ ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেন-ফেরি পরিষেবা ইউরোপে এখন বিরল।
সম্প্রতি ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা ফ্যালন তাঁর মায়ের সঙ্গে রোম থেকে সিসিলি যাওয়ার পথে রাতের এই ব্যতিক্রমী ট্রেনযাত্রা করেন। তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সমুদ্র পার হওয়ার সময় ট্রেনটি ফেরির ভেতরে অবস্থান করে। যাত্রীরা চাইলে নিজেদের কেবিনে বিশ্রাম নিতে পারেন, আবার বাইরে বেরিয়ে জাহাজ থেকে চারপাশের জলরাশির দৃশ্যও উপভোগ করতে পারেন।
ট্রেনের ভেতর থেকেই ফেরিতে ওঠার অভিজ্ঞতা
ইনস্টাগ্রামে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফ্যালন লিখেছেন, “আমার জীবনে চড়া সবচেয়ে ব্যতিক্রমী স্লিপার ট্রেন এটি। কারণ, সমুদ্র পার হওয়ার জন্য ট্রেনটি আক্ষরিক অর্থেই একটি ফেরির ওপর উঠে যায়। এই ভ্রমণে আমি মাকে সঙ্গে নিয়েছিলাম। মাত্র ১৪০ ডলারে, যা একটি সাধারণ হোটেলকক্ষের ভাড়ার সমান, আমরা পাশাপাশি সংযুক্ত দুটি ব্যক্তিগত কেবিন পেয়েছিলাম। রোম থেকে ট্রেনে উঠে ইতালির উপকূল ধরে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙার ঠিক আগে দেখি, আমাদের ট্রেনটি সিসিলির পথে ফেরিতে উঠছে।”
তিনি আরও বলেন, “জানালার বাইরে জাহাজের ভেতরের অংশকে এভাবে সরে যেতে দেখা ছিল অবিশ্বাস্য এক অভিজ্ঞতা। আমরা পালার্মো পর্যন্ত যাওয়ার টিকিট কেটেছিলাম। তবে পথে তাওরমিনা শহর ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে আগেই ট্রেন থেকে নেমে পড়ি। কয়েক দিন পর আবার যাত্রা শুরু করি পালার্মোর পথে। সেই যাত্রাপথের প্রাকৃতিক দৃশ্যও ছিল দারুণ মনোরম।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া
ফ্যালনের পোস্টের পর অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত জানিয়েছেন। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এটি অসাধারণ! জীবনে অন্তত একবার হলেও সবার এই ট্রেনে ভ্রমণ করা উচিত।”
আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “ডেনমার্ক ও জার্মানির মধ্যেও এমন একটি ট্রেন-ফেরি চলত।”
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আরেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আমি কয়েকবার এই পথে ভ্রমণ করেছি। প্রতিবারই ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা। এখন এটিই বিশ্বের শেষ ট্রেন-ফেরি। বাকি দুটি কোভিডের সময় চলাচল বন্ধ করেছিল, পরে আর পরিষেবা চালু করেনি।”
ডেনমার্ক ও জার্মানির মধ্যকার ট্রেন-ফেরি পরিষেবা বন্ধ হওয়ার খবর জেনে বিস্ময় প্রকাশ করে একজন লিখেছেন, “এই পোস্টের মাধ্যমে জানতে হবে যে ডেনমার্ক থেকে জার্মানির ট্রেন-ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, তা ভাবিনি।”
আরেক ব্যবহারকারী ১৯৭২ সালের স্মৃতি ভাগ করে লিখেছেন, “আমার মনে আছে, সে বছর ডোভার থেকে কালে পর্যন্ত ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ট্রেন-ফেরিতে গিয়েছিলাম। প্যারিসে ট্রেন বদলে রোমগামী আরেকটি ট্রেনে উঠেছিলাম। এরপর আরও একবার ট্রেন বদলে ক্যাসিনোতে থাকা আত্মীয়দের কাছে পৌঁছাই। ছোটবেলায় অভিজ্ঞতাটি ছিল দারুণ মজার। এখন যদি সেই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু থাকত, তাহলে আরও বেশি উপভোগ করতাম।”
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্যটনস্থলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। এক ব্যবহারকারীর ভাষ্য, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।”
টিকিট কাটবেন যেভাবে
ফ্যালনের পরামর্শ, অন্য বুকিং সাইটের অতিরিক্ত ফি এড়াতে ট্রেনিতালিয়ার অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে টিকিট কাটা ভালো। তাওরমিনা যেতে চাইলে রোমা তেরমিনি থেকে তাওরমিনা-জারদিনি স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন খুঁজতে পারেন। আর পালার্মো পর্যন্ত যেতে চাইলে গন্তব্য হিসেবে নির্বাচন করতে হবে পালার্মো চেন্ত্রালে।
সাধারণত যাত্রার ৯০ থেকে ১২০ দিন আগে টিকিট পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন এই কনটেন্ট নির্মাতা। ট্রেনে খাবারের বিকল্প সীমিত থাকায় সঙ্গে হালকা খাবার রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ইতালির উপকূল ধরে রাতের ট্রেনযাত্রা, ঘুম থেকে উঠে ফেরিতে ওঠার দৃশ্য এবং সমুদ্র পার হওয়ার অভিজ্ঞতা- সব মিলিয়ে এই ভ্রমণ প্রচলিত রেলযাত্রার চেয়ে আলাদা। তবে টিকিট কাটার আগে নির্দিষ্ট তারিখে ট্রেনের সময়সূচি, কেবিনের ধরন ও ভাড়া যাচাই করে নেওয়া ভালো।