প্রকৃতির হাতে তৈরি ভূদৃশ্য কতটা বিচিত্র হতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ চীনের ইউনান প্রদেশের শিলিন পাথুরে বন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সারি সারি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গেলে বোঝা যায়, সেগুলো গাছ নয়, আকাশের দিকে উঠে থাকা বিশাল সব পাথর। কোথাও সরু স্তম্ভ, কোথাও খাঁজকাটা দেয়ালের মতো শিলা, আবার কোনও পাথরের অবয়বের সঙ্গে মিলে যায় মানুষ কিংবা পশুপাখির আকৃতি।
ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই পাথুরে বন। মৃদু আবহাওয়ার জন্য কুনমিং পরিচিত ‘চির বসন্তের শহর’ নামে। সেই শহর থেকে সড়কপথে শিলিনে পৌঁছে দেখা যায়, সবুজ বনভূমির প্রচলিত ধারণার বাইরে এক বিশাল পাথুরে জগৎ।
কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস
শিলিনের পাথুরে ভূদৃশ্য গড়ে উঠেছে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায়। বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রায় ২৭ কোটি বছর আগে এই অঞ্চলে সামুদ্রিক পরিবেশ ছিল। সমুদ্রের তলদেশে জমা হওয়া চুনাপাথর পরবর্তী সময়ে ভূত্বকের পরিবর্তন, পানি ও ক্ষয়ের প্রভাবে নানা আকার ধারণ করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকায় তৈরি হয়েছে পাথরের উঁচু স্তম্ভ, সরু পথ ও গোলকধাঁধার মতো গঠন।
পাথরগুলোর উচ্চতা ও আকৃতিতে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। কিছু শিলা কয়েক মিটার উঁচু, আবার কিছু প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত উঠে গেছে। ধূসর রঙের পাথরগুলো বৃষ্টিতে ভিজে গেলে গাঢ় খয়েরি আভা ধারণ করে। তখন শিলাস্তম্ভের খাঁজ ও গায়ে তৈরি হওয়া ছায়া ভূদৃশ্যটিকে আরও নাটকীয় করে তোলে।
আশিমাকে ঘিরে স্থানীয় উপকথা
শিলিনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আশিমা নামের এক তরুণীকে ঘিরে প্রচলিত লোককাহিনি। স্থানীয় সানি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে পরিচিত এই কাহিনিতে আশিমার প্রেম, পারিবারিক বাধা ও বেদনার কথা বলা হয়।
উপকথা অনুযায়ী, আশিমা অন্য এলাকার এক যুবকের প্রেমে পড়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের আপত্তিতে তাঁদের সম্পর্ক পূর্ণতা পায়নি। গভীর দুঃখে আশিমা পাথরে পরিণত হন। তাঁর পাশে একের পর এক পাথর উঠে আসে, যেন সেগুলো তাঁকে একা থাকতে দিচ্ছে না।
শিলিনের একটি পাথরের অবয়বকে স্থানীয়ভাবে আশিমার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। দূর থেকে সেটিকে মাথায় কাপড় বাঁধা, পিঠে ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণীর মতো মনে হয়। এটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
উৎসব ও সানি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি
শিলিনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আশিমার কাহিনি স্থানীয় সানি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। প্রতি বছর ২৪ জুনের কাছাকাছি সময়ে পালিত হয় ঐতিহ্যবাহী মশাল উৎসব, যা ‘টর্চ ফেস্টিভ্যাল’ নামেও পরিচিত। উৎসবকে ঘিরে লোকনৃত্য, কুস্তি, ষাঁড়ের লড়াই এবং নানা ধরনের লোকজ আয়োজন দেখা যায়।
বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি
শিলিন পাথুরে বন বিস্তৃত একটি বড় ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চল। এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে লিজিং পাথুরে বন, নাইগু পাথুরে বন, ঝিয়ুন গুহা, চাং হ্রদ, ইউ হ্রদ, দাদিয়ে জলপ্রপাত ও কিফেং গুহার নাম উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি এলাকার ভূপ্রকৃতিতে রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
২০০৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় দক্ষিণ চীনের কার্স্ট ভূপ্রকৃতির অংশ হিসেবে শিলিনের কয়েকটি এলাকা।
পাথরের গোলকধাঁধায় ঘোরার অভিজ্ঞতা
শিলিন ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট হাঁটার পথ। বিশাল পাথরের মাঝখানে তৈরি সরু গলি ধরে এগোলে কখনও মনে হবে পাথরের দেয়াল দুপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে, আবার কোথাও পথ খুলে গিয়ে সামনে দেখা দেবে বিস্তৃত শিলাস্তম্ভের সারি। অনেক জায়গায় পাথরের আকৃতি ও অবস্থানের কারণে একই ভূদৃশ্যকে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আলাদা দেখায়।
এলাকার নির্দিষ্ট অংশ ঘুরে দেখার জন্য বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে পাথরের গঠন কাছ থেকে দেখতে চাইলে হাঁটাপথে ঘোরাই বেশি ভালো।
শিলিনের বিশেষত্ব এর পাথরের আকারে যেমন, তেমনই কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে। স্থানীয় উপকথা, সানি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও প্রকৃতির দীর্ঘ পরিবর্তনের কারণে চীনের এই পাথুরে অঞ্চল এক বিরল প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে।