ব্যস্ত ঢাকায় পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরির নতুন ঠিকানা, টিকিট ১০ টাকা

রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনে একটু স্বস্তির খোঁজে সবুজের সান্নিধ্যে সময় কাটাতে চান অনেকেই। হাঁটাহাঁটি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা পরিবার নিয়ে অবসর কাটাতে নগরবাসীর জন্য নতুন করে খুলেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওসমানী উদ্যান। প্রবেশমূল্য মাত্র ১০ টাকা। প্রায় ৯ বছর বন্ধ থাকার পর গত ২০ অক্টোবর থেকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে আধুনিকায়িত ঐতিহাসিক এ উদ্যান।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকালে সরেজমিনে উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশপথে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকছেন দর্শনার্থীরা। কেউ হাঁটাহাঁটি করছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও উদ্যানটি অবসর কাটানোর একটি সুবিধাজনক জায়গা হয়ে উঠছে। উদ্যানের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রবেশপথে টিকিট ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতা রয়েছে।

ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের পাশে প্রতীকী কবর। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

প্রায় ২৪ একর আয়তনের ওসমানী উদ্যান একসময় পুরান ঢাকা তথা রাজধানীর মানুষের হাঁটাহাঁটি, বিশ্রাম ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। উন্নয়নকাজের দীর্ঘসূত্রতায় দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর উদ্যানটি আবারও ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন নগরবাসী। তবে আধুনিকায়নে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়ে অবকাঠামো নির্মাণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় হাজারো গাছ কেটে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

উদ্যানের টিকিটের দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মচারী মো. মানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এই পার্কে প্রবেশ করতে টিকিট কাটতে হয়। ১০ টাকা টিকিটের মূল্য। গত ১৯ অক্টোবর উদ্বোধনের পর ২০ অক্টোবর থেকে পার্ক জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রথম শিফট এবং দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পার্ক খোলা থাকে।’

ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে ভাষা আন্দোলনের শিল্পকর্ম

দর্শনার্থীদের উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী এবং পরিবার-পরিজন মিলে সবাই ঘুরতে আসেন। বিগত কয়েক দিন সরকারি ছুটি থাকায় পার্কে লোকজনের আনাগোনা কম। সকালে অনেকেই টিকিট কেটে হাঁটতে আসেন।’

নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে মানিক বলেন, ‘২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা থাকে। আনসার সদস্যরা তিন শিফটে কাজ করেন। এ পর্যন্ত দুটি প্রবেশগেটে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টিকিট কাটা হয়েছে।’

জুমার নামাজ শেষে বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীদের সঙ্গে উদ্যানটিতে ঘুরতে আসেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। উদ্যানের পরিবেশ দেখা এবং কিছুটা হাঁটাহাঁটি করাই ছিল তার আসার উদ্দেশ্য।

মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নামাজ শেষে আমার বন্ধু-কলিগকে সঙ্গে করে এখানে একটু হাঁটতে এসেছি। এখানকার পরিবেশ কেমন, সেটিও দেখতে এসেছি। বাসার কাছে হওয়ায় আমাদের জন্য কিছুটা সুবিধা হয়েছে।’

পার্কটিতে ঘুরতে আসছেন অনেকেই। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

রাজধানীর ব্যস্ততার মধ্যে বাসার কাছাকাছি হাঁটাহাঁটি ও সময় কাটানোর মতো জায়গা পেলে তা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দারা এমন উদ্যানে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, শরীরচর্চা এবং পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পান।

টিকিট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

দীর্ঘদিন উদ্যানটি বন্ধ থাকার পর পার্কটি চালু হওয়া নিয়ে অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করছেন। তারা বলছেন, বিনোদনের উন্মুক্ত স্থানে ফি নেওয়ার নিয়ম নগরবাসীর জন্য উৎসাহব্যঞ্জক নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পার্কের ভেতরে অবস্থিত জাদুঘর, জিমনেসিয়াম ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা এখনও চালু হয়নি। কোনো অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার আগপর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজ দায়িত্বে এটি রক্ষণাবেক্ষণ করছে। টিকিটের বিষয়ে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্যানের সৌন্দর্য ও পরিবেশ সুরক্ষিত রাখতে রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে এই প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনেকেই পার্কে আসেন হাঁটতে। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, উদ্যানের আশপাশের হকার ও অসচেতন মানুষের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণে না রাখলে পার্ক অপরিচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া উদ্যানটিতে প্রতিদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে অন্তত ১৫-১৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত রাখতে হয়। তাদের খরচের বিষয়ও আছে। অনেকেই কর্তৃপক্ষের এই যুক্তির সঙ্গে ঐকমত্য জানিয়ে বলছেন, পার্কটি ফ্রি করে দেওয়া হলে গুলিস্তানের মতো জায়গায় এক মাসের মধ্যেই ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে। তখন আর সাধারণ মানুষের ঘোরাঘুরির পরিবেশ থাকবে না।

শুক্রবার কথা পার্কে আসা দর্শনার্থী রায়হানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখনকার দিনে ১০ টাকা আসলে কিছুই না। তবে এই ১০ টাকা টিকিটের কারণে অন্তত ভবঘুরেরা পার্কে প্রবেশ করবে না। এটা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্যই ভালো।’

তবে উদ্যানের প্রবেশপথে টিকিট কাটা নিয়ে ভিন্ন একটি চিত্রও দেখা গেছে। টিকিট না কেটেই ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী যুবক সুমন হোসেন। পরে টিকিট বিক্রেতার অনুরোধে তিনি টিকিট কাটেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে আমার বন্ধুরা বোঝানোর পর টিকিট কেটেছি। আমরা স্থানীয়। টিকিট না কাটলে পার্কের পরিবেশ তো ভালো থাকবে না। তাই টিকিট কেটেছি।’

উদ্যানে কী কী আছে

ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়নে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের আওতায় সীমানাপ্রাচীর, নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, ১২টি দোকান, ব্যায়ামাগার, গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান, লেকের পাড় উন্নয়ন, ঘাট, হাঁটার পথ ও বিদ্যুতের উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে শিশুদের খেলার জায়গা, খাবারের দোকান, টেবিল টেনিস ও বিলিয়ার্ড খেলার ব্যবস্থা, এটিএম বুথ ও ওষুধের দোকান।

পার্কে বিশ্রাম নিচ্ছেন কয়েকজন

উদ্যানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ৯০ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ স্মৃতিস্তম্ভে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের নাম খোদাই করা হয়েছে। এর সঙ্গে থাকা অর্ধগোলাকার অংশে ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। উদ্যানের দুই পাশের প্রবেশপথে ইংরেজি ‘২৪’ সংখ্যার আদলে দুটি ফটকও তৈরি করা হয়েছে।

প্রায় ১৪৬ কোটি টাকার প্রকল্প

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ওসমানী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নাম দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যানটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করে উদ্যানটি নগরবাসীর জন্য খুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগেছে।

শুরুতে উন্নয়নকাজের দায়িত্ব পায় দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নানা অনিয়ম ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। পরে ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটিই শেষ পর্যন্ত কাজ করেছে।

সবুজে ঘেরা ওসমানী উদ্যান

পরবর্তী সময়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে উদ্যানটিতে স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি ফটক নির্মাণ শুরু করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রথমে এ কাজের জন্য ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও নকশায় পরিবর্তনের পর নির্মাণ ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৩৮ কোটি টাকায়। সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে উদ্যানটিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

অবকাঠামো উন্নয়নে নষ্ট হয়েছে উদ্যানের চরিত্র

নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ওসমানী উদ্যানে অবকাঠামোগত কাজ বেশি করতে গিয়ে পার্কটির নিজস্ব চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে।

ওসমানী উদ্যান

তিনি বলেন, প্রকৃতিবান্ধব নকশায় উন্নয়নকাজ করা হলে এত বেশি সময় লাগতো না। অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে গিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে। আসলে একটি চক্র আছে, যারা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কারণ, এসব কাজে বাজেট বেশি থাকে, দুর্নীতির সুযোগও বেশি।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বস্তি নগরবাসীর

প্রায় এক দশক পর ওসমানী উদ্যান উন্মুক্ত হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুরান ঢাকার বংশাল এলাকার বাসিন্দা আফতাব চৌধুরী বলেন, একসময় ওসমানী উদ্যানে সকালে ও বিকালে শত শত মানুষ হাঁটতে ও ব্যায়াম করতে আসতেন। অনেকে পরিবার নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই সুযোগ ছিল না। বংশাল এলাকাতেও এত বড় জায়গা আর কোথাও নেই।

তিনি আরও বলেন, প্রায় এক দশক পর উদ্যানটি উন্মুক্ত করা হলেও সরকারকে ধন্যবাদ। কারণ, ইট-পাথরের এই শহরে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো জায়গা নেই। পরিবার নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো স্থানও নেই। যদিও গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে, এবার সরকারের উচিত উদ্যানে নতুন করে বেশি করে গাছ লাগানো।