নীল সমুদ্র, মেরিন ড্রাইভের পাহাড়ি দৃশ্য আর সেন্ট মার্টিনে যাতায়াতের সম্ভাবনাসহ কক্সবাজারের টেকনাফে সাবরাং পর্যটন পার্ককে ঘিরে রয়েছে বড় পরিকল্পনা। এখানে গড়ে তোলার কথা আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র ও পর্যটকসেবার নানা ব্যবস্থা। তবে এক দশক পেরিয়েও প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবকাঠামোগত উন্নয়নের অগ্রগতি মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। সমুদ্রভাঙন, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এখনও নির্মাণকাজ শুরু করতে পারেননি।
৯৬৭ একরের পরিকল্পনা, অবশিষ্ট রয়েছে প্রায় ৫০০ একর
সাবরাং এক্সকলুসিভ টুরিস্ট পার্ক প্রকল্পের উন্নয়নকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৯৬৭ একর জমি নিয়ে প্রকল্পটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মূল লক্ষ্য ছিল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আধুনিক অবকাশকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো।
কিন্তু সমুদ্রভাঙনে পরিকল্পিত এলাকার প্রায় ৫০০ একর জমি হারিয়ে গেছে বলে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। বর্তমানে অবশিষ্ট জমিতে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কী কী থাকার পরিকল্পনা রয়েছে?
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাবরাংয়ে পাঁচ তারকা মানের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার কথা। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ইকোট্যুরিজম, সামুদ্রিক অ্যাকোয়ারিয়াম, সি-করুজ এবং পানির নিচে রেস্তোরাঁর মতো ব্যতিক্রমী সুবিধার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের সম্মিলিত প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৭৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমি ইজারার চুক্তি হয়েছে, বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য পর্যটনসেবা চালুর ক্ষেত্রে মূল বাধা হয়ে রয়েছে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অসম্পূর্ণতা।
উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা কী?
প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন ও মাটি ভরাটের কাজ এগোলেও অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন এবং স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখনও অসম্পূর্ণ। এসব সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ শুরু করতে পারছেন না।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পর বাঁধ নির্মাণে প্রায় তিন বছর লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অন্য অবকাঠামো উন্নয়নেও আলাদা প্রকল্পের প্রয়োজন হবে। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হতে আরও পাঁচ থেকে দশ বছর লাগতে পারে বলে জানা গেছে।
সেন্ট মার্টিনে যাতায়াতে নতুন জেটির পরিকল্পনা
সাবরাং প্রকল্পের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি আধুনিক জেটি নির্মাণ। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি হয়। সাবরাং পর্যটন পার্কের পাঁচ একর জমি জেটি নির্মাণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জেটিটি কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক পরিবহনে কাজে লাগানো হবে।
২৫ সেপ্টেম্বর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব জানান, জেটি নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কাজ শেষ করতে আনুমানিক দুই বছর লাগতে পারে। জেটি চালু হলে বড় লঞ্চ ও জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে সেন্ট মার্টিনের সঙ্গে নৌযোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি টেকনাফের পর্যটন খাতের বিকাশেও সহায়তা মিলতে পারে। তবে জেটি এখনও চালু হয়নি।
এখন কি সাবরাং ঘুরতে যাওয়া যাবে?
হ্যাঁ, সাবরাং এলাকার সমুদ্রতীর ও আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে যাওয়া যায়। তবে পরিকল্পিত পর্যটন পার্কের সব সুবিধা এখনও চালু না হওয়ায় এটি পূর্ণাঙ্গ রিসোর্ট বা বিনোদনকেন্দ্র হয়নি।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে প্রথমে বাসে বা বিমানে কক্সবাজার যেতে হবে। কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভধরে টেকনাফের দিকে গেলে সাবরাং এলাকায় পৌঁছানো যায়। কক্সবাজার থেকে সাবরাংয়ের দূরত্ব প্রায় ৮৪ থেকে ৯০ কিলোমিটার। গাড়ির ধরন, যানজট ও রাস্তার পরিস্থিতির ওপর যাত্রার সময় নির্ভর করবে।
কক্সবাজার থেকে টেকনাফগামী বাস বা স্থানীয় পরিবহনে যাওয়ার আগে গন্তব্য হিসেবে সাবরাং পর্যটন পার্ক বা সাবরাং সৈকতের কথা জানিয়ে নিন। প্রয়োজনে টেকনাফ থেকে স্থানীয় যানবাহন নিতে পারেন। ভাড়া নির্দিষ্ট নয়, তাই যাত্রার দিন পরিবহন সংস্থার কাছ থেকে বর্তমান ভাড়া জেনে নিন।
সাবরাংকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তবে বাস্তবায়নের পথে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সমুদ্রভাঙন ঠেকানো, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্পন্ন করাই এখন প্রকল্পটির অগ্রগতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।