ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন স্থাপত্য, যেগুলো পরিচিত পর্যটনস্থলের আড়ালে অনেকটাই অচেনা। পাথরে খোদাই করা বিশাল মূর্তি, শতাব্দীপ্রাচীন মন্দির, কাঠের কারুকাজ করা রাজপ্রাসাদ কিংবা পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গসহ এমন ইতিহাস ও স্থাপত্যের নানা নিদর্শন দেখতে ঘুরে আসতে পারেন এমন সাতটি স্থানে।
ঊনকোটি, ত্রিপুরা: ঘন সবুজ পাহাড় আর ঝরনার মাঝে পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে দেবদেবীর বিশাল মুখাবয়ব। এখানকার প্রায় ৩০ ফুট উঁচু কালভৈরবের মূর্তি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। লোককথা অনুযায়ী, শিবের সঙ্গে এক কোটি দেবদেবী এখানে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বাদ পড়ায় নাম হয় ঊনকোটি। অক্টোবর থেকে মার্চ এই স্থান ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।
বটেশ্বর মন্দির, মধ্যপ্রদেশ: গ্বালিয়র থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বটেশ্বর মন্দিরগুচ্ছে রয়েছে প্রায় ২০০টি প্রাচীন মন্দির। অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে গুর্জর-প্রতিহার রাজাদের আমলে নির্মিত এই মন্দিরগুলি একসময় জঙ্গলের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল। পরে পুরাতাত্ত্বিকদের উদ্যোগে সেগুলি উদ্ধার করা হয়। শিব, বিষ্ণু ও শক্তির উদ্দেশে নির্মিত মন্দিরগুলি প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
লেপাক্ষী, অন্ধ্রপ্রদেশ: বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সময় নির্মিত বীরভদ্র মন্দিরের পাথরের কারুকাজ পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। মন্দিরের ৭০টি স্তম্ভের মধ্যে একটি মেঝে স্পর্শ না করেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্তম্ভটির নীচের ফাঁক দিয়ে কাপড় গলিয়ে দেওয়া যায়। কাছেই রয়েছে বিশাল গ্রানাইট পাথরে তৈরি নন্দীমূর্তি। অক্টোবর থেকে মার্চ লেপাক্ষী ভ্রমণের ভালো সময়। বেঙ্গালুরু থেকে গাড়িতে প্রায় আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছনো যায়।
চাঁদ বাওড়ি, রাজস্থান: রাজস্থানের আভানেরীতে অবস্থিত এই প্রাচীন জলাধারটি নির্মিত হয়েছিল জল সংরক্ষণের জন্য। প্রায় ১৩ তলা গভীর কুয়োটিতে রয়েছে সাড়ে তিন হাজার পাথরের সিঁড়ি। নবম শতকে রাজা চন্দের উদ্যোগে তৈরি এই স্থাপত্যের সিঁড়িগুলি এমনভাবে সাজানো যে উপর থেকে দেখলে জ্যামিতিক নকশার মতো মনে হয়। কুয়োর এক পাশে রয়েছে স্তম্ভযুক্ত বারান্দা, যা একসময় রাজপরিবারের বিশ্রামের কাজে ব্যবহৃত হত।
পদ্মনাভপুরম প্রাসাদ, তামিলনাড়ু: তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী জেলায় অবস্থিত এই প্রাসাদ একসময় ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের রাজধানী ছিল। কাঠের তৈরি চারতলা প্রাসাদটির দেওয়াল, ছাদ ও স্তম্ভে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকাজ। মেহগনি ও সেগুন কাঠের ব্যবহার এবং বিশেষ নির্মাণশৈলী প্রাসাদটিকে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। প্রাসাদের মেঝে তৈরিতে ব্যবহৃত বিশেষ মিশ্রণ শতাব্দী পেরিয়েও তার মসৃণতা ধরে রেখেছে। তিরুঅনন্তপুরম থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে এই প্রাসাদ।
জিঞ্জি দুর্গ, তামিলনাড়ু: তিনটি পাথুরে পাহাড়কে ঘিরে তৈরি এই দুর্গ একসময় সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছত্রপতি শিবাজীর নেতৃত্বে ১৬৭৭ সালে মরাঠারা দুর্গটি দখল করেন। দুর্গের ভিতরে রয়েছে সাততলা কল্যাণ মহল, রাজকীয় স্নানাগার ও বিশাল শস্যভান্ডার। পাহাড়ের উপরে পৌঁছতে অনেকগুলি খাড়া পাথরের সিঁড়ি পেরোতে হয়। পুদুচেরি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দুর্গ ভ্রমণের ভালো সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি।
বাসগো রাজপ্রাসাদ ও গুম্ফা, লাদাখ: লেহ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সিন্ধু নদের উপত্যকায় রয়েছে বাসগোর প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। মাটি, পাথর ও কাঠ দিয়ে নির্মিত এই স্থাপত্য একসময় লাদাখের রাজধানীর অংশ ছিল। ধসে পড়া দেওয়ালের মাঝেও টিকে রয়েছে প্রাচীন বৌদ্ধ গুম্ফা। ভিতরে দেখা যায় পুরনো ফ্রেস্কো ও বিশাল মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি। মে থেকে অক্টোবর এই অঞ্চল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।
ভারতের এই সাতটি ঐতিহাসিক স্থান প্রাচীন রাজ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, জল সংরক্ষণ এবং নির্মাণকলার নানা দিক তুলে ধরে। পরিচিত পর্যটনস্থলের বাইরে ইতিহাসের খোঁজে বেরোতে চাইলে এগুলি ভ্রমণতালিকায় রাখতে পারেন।