আন্দামানের নীল জলরাশির মাঝে ধোঁয়া ওঠে যে আগ্নেয় দ্বীপ থেকে

ভারতের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য যেন অফুরন্ত। কোথাও তুষারাবৃত পাহাড়, কোথাও বিস্তীর্ণ মরুভূমি, আবার কোথাও ঘন সবুজ বনভূমি। এরই মধ্যে মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে আন্দামান সাগরে রয়েছে এক রহস্যময় দ্বীপ, যার কথা অনেকেরই অজানা। নাম ব্যারেন দ্বীপ। এখানেই রয়েছে ভারতের একমাত্র স্বীকৃত সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। জনবসতিহীন এই দ্বীপ কখনও কখনও বিমানে যাতায়াতের সময়ও চোখে পড়তে পারে।

সম্প্রতি কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও পাইলট চিদাম্বরম মেয়াপ্পন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্বীপটির অবস্থান, ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮৭ সালে ব্যারেন দ্বীপে প্রথম নথিভুক্ত অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। দ্বীপটির প্রায় ১৪০ কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে নারকোন্ডাম দ্বীপ, যা আগ্নেয় উৎসের আরেকটি দ্বীপ।

সমুদ্রের মাঝখানে আগুনের পাহাড়

ব্যারেন দ্বীপের বিশেষত্ব হলো, এর আগ্নেয়গিরি এখনও সক্রিয়। দীর্ঘ সময় সুপ্ত থাকার পর ১৯৯১ সালে এখানে আবার অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে আগ্নেয় কার্যকলাপের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ব্যাংককের উদ্দেশে উড়ে যাওয়ার সময় নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মেয়াপ্পন জানান, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করার প্রায় ১০ মিনিট পর বিমানের জানালা দিয়ে নিচে তাকালে সমুদ্রের মাঝখানে একটি ছোট দ্বীপ থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যেতে পারে। সেটিই ব্যারেন দ্বীপ।

সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে দ্বীপটির উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ১৬০ ফুট। তবে এর প্রকৃত বিস্তার পানির নিচে। মেয়াপ্পনের বর্ণনা অনুযায়ী, সমুদ্রের তলদেশে এর সঙ্গে যুক্ত বিশাল আগ্নেয় পর্বত রয়েছে, যার অধিকাংশই পানির নিচে ঢাকা। ফলে ওপর থেকে দ্বীপটিকে ছোট মনে হলেও এর ভূতাত্ত্বিক গঠন অনেক বেশি বিস্তৃত।

নাম ব্যারেন, তবু প্রাণের উপস্থিতি

‘ব্যারেন’ শব্দের অর্থ অনুর্বর বা প্রাণহীন। কিন্তু নামের সঙ্গে দ্বীপটির বাস্তব চিত্র পুরোপুরি মেলে না। এর ঢালে বুনো ছাগল বিচরণ করে, গাছে আশ্রয় নেয় ফলখেকো বাদুড়। দ্বীপটির চারপাশের সমুদ্রেও রয়েছে বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য।

মেয়াপ্পনের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮৯০-এর দশকে ব্রিটিশ নাবিকেরা ব্যারেন দ্বীপে কয়েকটি ছাগল নিয়ে এসেছিলেন। পরে সেগুলোকে দ্বীপটিতে রেখে যাওয়া হয়। প্রতিকূল পরিবেশেও ছাগলগুলো কীভাবে টিকে ছিল, তা দ্বীপটির প্রকৃতি নিয়ে কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়।

পর্যটকদের জন্য কী রয়েছে?

ব্যারেন দ্বীপে পর্যটকদের সরাসরি নেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এর আশপাশের সামুদ্রিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। স্বরাজ দ্বীপ, যা আগে হ্যাভলক দ্বীপ নামে পরিচিত ছিল, সেখান থেকে ডাইভিং ভ্রমণের মাধ্যমে আশপাশের প্রবালপ্রাচীর ও পানির নিচের জগৎ ঘুরে দেখেন পর্যটকেরা।

সমুদ্রের তলদেশে আগ্নেয় ছাইয়ের কারণে কালো বালির উপস্থিতিও এই অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। আগ্নেয়গিরি, প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে ব্যারেন দ্বীপের আশপাশের জলরাশি প্রকৃতিপ্রেমী ও ডুবুরিদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা

ব্যারেন দ্বীপ নিয়ে মেয়াপ্পনের পোস্টের পর ইনস্টাগ্রামে নানা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। কেউ দ্বীপটিকে ‘সবচেয়ে সুন্দর দ্বীপ’ বলে উল্লেখ করেছেন, আবার কেউ এর প্রবালপ্রাচীরের অসাধারণ সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরেছেন।

এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, সুনামির এক বছর আগে তাঁর ব্যারেন দ্বীপের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে হাঁটার সৌভাগ্য হয়েছিল। অন্য একজন লিখেছেন, ভারতের প্রকৃতিগত বৈচিত্র্য এতটাই বিস্তৃত যে এখানে প্রায় সব ধরনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই দেখা যায়। আরেক ব্যবহারকারী দ্বীপের বাসিন্দা হিসেবে গর্ব প্রকাশ করেছেন।

কেউ কেউ ব্যারেন দ্বীপকে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

সব মিলিয়ে, ব্যারেন দ্বীপ এমন এক প্রাকৃতিক বিস্ময়, যেখানে আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা, সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিশাল ভূতাত্ত্বিক কাঠামো এবং বন্য প্রাণীর উপস্থিতি এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছে। আন্দামান সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় জানালার নিচে দেখা ছোট্ট দ্বীপটি যে এত বৈচিত্র্য ও ইতিহাস ধারণ করে আছে, তা অনেকের কাছেই অজানা।