একসময় যেখানে ছিল রাজ্যের রাজধানী, দুর্গের নিরাপত্তা আর রাজকীয় আয়োজন, আজ সেখানে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে অতীতের স্মৃতিচিহ্ন। নেই রাজা, রাজদরবার ও পাইক-পেয়াদার আনাগোনা। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা সেই জনপদের নাম ভূষণা। আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা সীতারাম রায়ের নাম। মাগুরার মহম্মদপুরে ছড়িয়ে থাকা তাঁর নির্মিত স্থাপনাগুলো আজও ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের টানে।
নদীর তীরে হারানো রাজ্যের স্মৃতি
মাগুরা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে মধুমতি ও নবগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা জনপদ মহম্মদপুর। ঐতিহাসিক ভূষণা রাজ্যের রাজধানী ছিল এই অঞ্চলেই। বর্তমান মাগুরা ও ফরিদপুর অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভূষণা একসময় ছিল গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এখানকার রাজা সীতারাম রায়ের স্মৃতি আজও ছড়িয়ে রয়েছে নানা স্থাপনায়।
সীতারাম রায়ের উত্থানের গল্পও বেশ চমকপ্রদ। তিনি মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের একজন আমলা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে জমিদারি লাভ করেন এবং নিজের প্রতিভা ও শক্তির জোরে রাজা উপাধি পান। এরপর রাজ্য বিস্তার ও সেনাবল বৃদ্ধির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের প্রভাব। একসময় নবাব সরকারের রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করে স্বাধীন শাসকের মতো নিজের জমিদারি পরিচালনা করতে শুরু করেন।
দুর্গ, পরিখা আর রাজপ্রাসাদের গল্প
নিজের শাসন ও জমিদারি সুরক্ষিত রাখতে সীতারাম রায় মহম্মদপুরে গড়ে তুলেছিলেন একাধিক দুর্গ, কাচারিবাড়ি এবং পরিখা দিয়ে ঘেরা রাজপ্রাসাদ। পূজা-অর্চনার জন্য নির্মাণ করেছিলেন দেবালয়। জনসাধারণের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে খনন করিয়েছিলেন বেশ কয়েকটি বড় জলাশয়।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের এই স্থাপনাগুলোর নান্দনিক কারুকাজ একসময়কার সমৃদ্ধ জনপদের পরিচয় বহন করে। স্থানীয়ভাবে এসব প্রত্নস্থানের অনেকগুলোই রাজবাড়ি নামে পরিচিত। সময়ের প্রবাহে রাজকীয় আয়োজন হারিয়ে গেলেও স্থাপনাগুলো এখনও অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে।
ইতিহাসের পথে এক দিনের ভ্রমণ
যাঁরা ইতিহাস ও পুরোনো স্থাপত্য দেখতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য মহম্মদপুর সেরা। এখানে এসে শুধু পুরোনো স্থাপনা দেখা নয়, বরং কল্পনায় ফিরিয়ে আনা যায় সেই সময়ের রাজ্য পরিচালনা, দুর্গের নিরাপত্তা আর নদীকেন্দ্রিক জনজীবনের ছবি।
মধুমতি ও নবগঙ্গা নদীর কাছের এই জনপদের পরিবেশও ভ্রমণে আনন্দর মাত্রা যোগ করবে।
সংরক্ষণে মিলতে পারে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
রাজা সীতারাম রায়ের রাজপ্রাসাদ ও অন্যান্য স্থাপনা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যথাযথভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে মহম্মদপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
ইতিহাসের এই নিদর্শনগুলো কেবল একজন রাজার স্মৃতি নয়। এগুলো একটি সময়, একটি জনপদ এবং বাংলার অতীত স্থাপত্য-ঐতিহ্যের পরিচায়ক। তাই মহম্মদপুরে ভ্রমণে পুরোনো ইট-পাথর দেখার পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া ভূষণা রাজ্যের গল্পের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যাবে।
রাজা সীতারাম রায়ের রাজ্য আজ আর নেই। নেই তাঁর রাজদরবারের জৌলুসও। তবু মহম্মদপুরের মাটিতে ছড়িয়ে থাকা স্থাপনাগুলো যেন নীরবে বলে যায় এক সময়ের ক্ষমতা, সাহস আর ইতিহাসের কথা। সেই গল্পের টানেই ঘুরে আসতে পারেন মাগুরার এই ঐতিহাসিক জনপদ থেকে।