ঘুম থেকে উঠে দরজা খুললেই সামনে রাস্তার বদলে থইথই জল। বাজারে যেতে গাড়ি নয়, ভরসা নৌকা। এমনকি বাড়ির অবস্থানও বদলে যায় জল ও হাওয়ার সঙ্গে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও ভারতের মণিপুরে লোকটাক হ্রদের বুকে রয়েছে এমনই এক ব্যতিক্রমী জনবসতি চম্পু খাংপোক।
প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ভাসমান উদ্ভিদস্তর বা ‘ফুমদি’র ওপর গড়ে উঠেছে এই গ্রাম। ফুমদি মূলত গাছপালা, মাটি ও জৈব পদার্থের স্তর, যা জলের ওপর ভেসে থাকে। তার ওপর বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরগুলোও জলের উচ্চতা ও স্রোতের সঙ্গে ওঠানামা করে। ফলে এখানকার জীবনযাত্রা অন্য সব গ্রামের তুলনায় একেবারেই আলাদা।
গ্রামবাসীদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ডিঙি নৌকা ও ছোট নৌযান। মাছ ধরা তাদের অন্যতম প্রধান জীবিকা। ফুমদির ওপর তৈরি বাড়িগুলিকে স্থানীয়ভাবে ‘খাংপোক’ বা ‘ফুমশাং’ বলা হয়। বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের মতো পরিষেবার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের মতো করে জীবনযাত্রা চালিয়ে যাচ্ছেন বাসিন্দারা।
লোকটাক হ্রদের আরেক আকর্ষণ ‘আত্থাপম’। ফুমদি দিয়ে তৈরি বৃত্তাকার কাঠামোগুলি মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। তবে এই ভাসমান বাস্তুতন্ত্র নানা পরিবেশগত সমস্যার মুখেও পড়েছে। হ্রদের জলের স্তর নিয়ন্ত্রণের ফলে ফুমদির স্বাভাবিক পুষ্টিচক্র ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ভাসমান বসতি ও জীববৈচিত্র্য দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
লোকটাক হ্রদের কাছেই রয়েছে কেইবুল লামজাও জাতীয় উদ্যান, যা ভাসমান ফুমদির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। বিপন্ন সানগাই হরিণ এই উদ্যানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ফুমদির ওপর হাঁটার সময় হরিণগুলির চলাফেরা দেখে মনে হয় যেন তারা নাচছে। সে কারণেই তাদের ‘ডান্সিং ডিয়ার’ বলা হয়।
কীভাবে যাবেন?
ইম্ফল থেকে লোকটাক হ্রদের দূরত্ব প্রায় ৪৮ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে বিমানে ইম্ফল পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি বা শেয়ার অটোয় হ্রদের কাছে যাওয়া যায়। এরপর স্থানীয় ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে ভাসমান গ্রাম ঘুরে দেখা সম্ভব। নৌকাভাড়া ও যাত্রার সময় ঋতু এবং ঘাটভেদে বদলাতে পারে।
থাকার জন্য সেন্দ্রা এলাকার পর্যটন আবাসন কিংবা মোইরাংয়ের হোমস্টে ও লজ বেছে নেওয়া যায়। ভাসমান গ্রামের পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে দিনের বেলায় নৌকাভ্রমণের পরিকল্পনা করাই ভালো। তবে যাওয়ার আগে স্থানীয় যাতায়াত, নিরাপত্তা ও পর্যটকদের প্রবেশের নিয়ম জেনে নিন।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অভিযোজনের এক অনন্য উদাহরণ এই ভাসমান জনবসতি। জলই যেখানে পথ, আর ভাসমান জমিই যেখানে ঘর, সেখানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও যে হবে অন্য রকম, তা বলাই বাহুল্য।