বন্যপ্রাণী নয়, সাফারিতে এ বার সঙ্গী বিশাল ভাসমান হিমশৈল!

সাফারি মানেই কি জঙ্গলে বাঘ-সিংহের খোঁজে বেরিয়ে পড়া? কিংবা মরুভূমিতে উটের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানো? সময় বদলেছে, বদলেছে সাফারির ধরনও। এবার বন্যপ্রাণীর বদলে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে বিশাল বিশাল ভাসমান হিমশৈল। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের হিমশীতল জলরাশিতে ছোট নৌকায় চেপে বরফের পাহাড়ের কাছাকাছি যাওয়ার এই অভিনব অভিজ্ঞতার নাম ‘আইসবার্গ সাফারি’। জঙ্গলের বদলে বরফে ঘেরা ফিয়র্ড, বাঘ-সিংহের বদলে ভাসমান বরফের বিশাল কাঠামো যেন প্রকৃতির অন্য এক রূপ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।

হিমবাহ থেকে বিশাল বরফের খণ্ড ভেঙে সমুদ্রে ভেসে এলে আইসবার্গ বা হিমশৈল তৈরি হয়। দূর থেকে এগুলোকে ছোট বরফের টুকরো মনে হলেও বাস্তবে এক একটি হিমশৈল বিশাল আকারের হয়। কোনওটি পাহাড়ের মতো উঁচু, কোনওটি আবার অদ্ভুত আকৃতির ভাস্কর্যের মতো। সাদা বরফের গায়ে নীল ও ফিরোজা রঙের আভা এই দৃশ্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

অদ্ভুত আকৃতির ভাস্কর্যের মতো আইসবার্গ (চবি: সংগৃহীত)

ছোট নৌকায় বরফের রাজ্যে অভিযান

আইসবার্গ সাফারিতে সাধারণত ছোট বিশেষ ধরনের নৌকা ব্যবহার করা হয়। জোডিয়াক বা রিজিড ইনফ্ল্যাটেবল বোটের মতো নৌকায় পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয় বরফে ঘেরা ফিয়র্ড ও উপকূলীয় জলপথে। অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে নৌকা এগিয়ে যায় ভাসমান হিমশৈলগুলির কাছাকাছি। সেখান থেকেই দেখা যায় বরফের বিশালত্ব, নানা আকৃতি এবং জলের উপর তার প্রতিফলন।

গন্তব্য ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই নৌভ্রমণে তিমি, সিল এবং সামুদ্রিক পাখিরও দেখা মিলতে পারে। বিশেষ করে হাম্পব্যাক ও মিনকে প্রজাতির তিমি দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিছু এলাকায়। তবে বন্যপ্রাণীর দেখা পাওয়া নিশ্চিত নয়।

বরফের গায়ে নীল ও ফিরোজা রঙের আভা (ছবি: সংগৃহীত)

গ্রিনল্যান্ডের কোন জায়গায় মিলবে এই অভিজ্ঞতা?

গ্রিনল্যান্ডের ইলুলিসাট আইসবার্গ সাফারির অন্যতম পরিচিত স্থান। এখানকার ইলুলিসাট আইসফিয়র্ড ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। সেরমেক কুজাল্লেক হিমবাহ থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ভেঙে এই ফিয়র্ডের মধ্য দিয়ে ডিসকো উপসাগরের দিকে ভেসে আসে। ফলে গোটা অঞ্চল জুড়েই দেখা যায় অসংখ্য বিশাল হিমশৈল। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এখানে নৌভ্রমণের জনপ্রিয়তা বেশি। গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ সময় দিনের আলো থাকায় পর্যটকেরা বরফের সৌন্দর্য উপভোগ করার বেশি সুযোগ পান।

পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের তাসিলাকেও রয়েছে আইসবার্গ সাফারির ব্যবস্থা। তবে এই ভ্রমণে বরফের পাহাড় দেখার পাশাপাশি তিমি দেখার সুযোগও তৈরি হতে পারে। অন্য দিকে, দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের কাকোরটক থেকে অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ের নৌভ্রমণে বরফে ঘেরা উপকূল ঘুরে দেখা যায়। স্থানীয় পর্যটন সংস্থা গ্রিনল্যান্ড সাগাল্যান্ডস-সহ বিভিন্ন সংস্থা এই ধরনের ভ্রমণের আয়োজন করে। তাদের তালিকাভুক্ত একটি নৌভ্রমণের খরচ জনপ্রতি ১,২৫০ ডেনিশ ক্রোন। এতে প্রায় ৫০ মিনিটের নৌভ্রমণের পাশাপাশি যাওয়া-আসার পথে অল্প হাঁটার সুযোগ রয়েছে।

আইসবার্গ সাফারিতে সাধারণত ছোট বিশেষ ধরনের নৌকায় ঘোরা যায় (ছবি: সংগৃহীত)

আইসল্যান্ডেও রয়েছে বরফের সাফারি

হিমশৈল দেখতে গ্রিনল্যান্ডে যাওয়াই একমাত্র উপায় নয়। আইসল্যান্ডের জোকুলসারলন হিমবাহ-হ্রদও এ ক্ষেত্রে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। কাছের ব্রেইদামেরকুরজোকুল হিমবাহ থেকে বরফের বড় বড় খণ্ড ভেঙে হ্রদের জলে ভেসে আসে। নীলাভ জলরাশির উপর সাদা বরফের বিশাল কাঠামো ভেসে থাকার দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। নৌভ্রমণের মাধ্যমে পর্যটকেরা এই বরফের খণ্ডগুলিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান।

আরও বড় অভিযানের পরিকল্পনা থাকলে পর্যটকেরা যেতে পারেন স্যালবার্ড কিংবা অ্যান্টার্কটিকায়। মেরু অঞ্চলের এই জায়গাগুলিতেও বিশাল হিমশৈল দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে সেখানে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজন অনেক বেশি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি।

সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে বিপদও

হিমশৈলের সৌন্দর্য যতই আকর্ষণীয় হোক, এর কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কারণ, জলের উপরে যে অংশটুকু দেখা যায়, তার তুলনায় অনেক বেশি বরফ থাকে জলের নীচে। ফলে বাইরে থেকে দেখে একটি হিমশৈলের প্রকৃত আকার বোঝা কঠিন। তাছাড়া বরফের ভারসাম্য বদলে গেলে হিমশৈল হঠাৎ উল্টে যেতে পারে। কখনও আবার বিশাল বরফের অংশ ভেঙে জলে পড়ে।

এই কারণে আইসবার্গ সাফারিতে অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আবহাওয়া, জলের পরিস্থিতি ও বরফের অবস্থান বিচার করে নৌকা চালান। পর্যটকদেরও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

জঙ্গলে বন্যপ্রাণী দেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই সাফারির মিল থাকলেও আকর্ষণ একেবারেই আলাদা। এখানে নেই ঘন অরণ্য কিংবা হিংস্র প্রাণীর আনাগোনা। রয়েছে বরফে ঢাকা পাহাড়, নীল জলরাশি আর প্রকৃতির তৈরি বিশাল সব হিমশৈল। যারা গতানুগতিক ভ্রমণের বাইরে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাদের কাছে গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের এই আইসবার্গ সাফারি হতে পারে এক অন্য রকম পর্যটন-আকর্ষণ।