শরতের রোদ মেখে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, দূরে বালিয়াড়ি, কোথাও পাইনবনের আঁকাবাঁকা পথ। চারপাশে ঝরে পড়া পাতার মচমচে শব্দ। কখনো চোখে পড়ছে হরিণ, কখনও কাঠঠোকরা কিংবা বুনো শূকর। এমন প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে নেদারল্যান্ডসের ভেলুভে অঞ্চলে। সাইকেলে চড়ে এখানকার বন, জাতীয় উদ্যান, ঐতিহাসিক প্রাসাদ ও শিল্পকেন্দ্র ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হলো-
নেদারল্যান্ডসের গেল্ডারল্যান্ড প্রদেশে অবস্থিত ভেলুভে অঞ্চলটি বনভূমি, পাহাড়ি ঢাল, বালিয়াড়ি ও বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের জন্য পরিচিত। আমস্টারডাম থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার দূরত্বে রয়েছে হোগে ভেলুভে ন্যাশনাল পার্ক। প্রায় ৫ হাজার ৪০০ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যানের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪০ কিলোমিটার সাইকেল চালানোর পথ। দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে প্রায় ২ হাজার সাদা রঙের সাইকেল, যেগুলো বিনা খরচে ব্যবহার করা যায়।
বনের পথে বন্যপ্রাণীর দেখা
ভেলুভে অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ এর জীববৈচিত্র্য। ওক, পাইন ও বার্চগাছে ঘেরা বনের মধ্যে হাঁটলে চোখে পড়তে পারে হরিণ, কাঠঠোকরা, বুনো শূকর ও বিভার। এখানকার বনে নেকড়েরও দেখা মেলে। প্রায় ১৫০ বছর পর ২০১৫ সালে নেদারল্যান্ডসে আবার নেকড়ের প্রত্যাবর্তন ঘটে। তবে নেকড়ের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।
এলাকার বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জানতে ঘুরে দেখা যেতে পারে নেচার সেন্টার দে গিঙ্কেল। সেখানে প্রকৃতিবিষয়ক গাইডের সঙ্গে বনের পরিবেশ ও প্রাণীদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। বন্যপ্রাণী দেখার জন্য রয়েছে বিশেষ পর্যবেক্ষণকেন্দ্রও।
প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাস ও শিল্প
ভেলুভে ভ্রমণে শুধু বনভূমি নয়, ইতিহাস ও শিল্পেরও দেখা মিলবে। আপেলডর্ন শহরের কাছে রয়েছে ১৭ শতকের রাজপ্রাসাদ প্যালেইস হেট লু। একসময় এটি ছিল উইলিয়াম অব অরেঞ্জ তৃতীয় ও তাঁর স্ত্রী মেরি দ্বিতীয় স্টুয়ার্টের গ্রীষ্মকালীন আবাস এবং শিকারের জায়গা। প্রাসাদের কারুকার্যময় কক্ষ, বিশাল সিঁড়ি, সাজানো বাগান এবং ভূগর্ভস্থ জাদুঘর দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
ঘুরে দেখা যায় ঐতিহাসিক শহর হার্ডারভাইকও। সরু পাথর বাঁধানো রাস্তা, মধ্যযুগীয় শহরপ্রাচীর ও পুরোনো টাউন হল শহরটির অতীতের পরিচয় বহন করে।
শিল্পপ্রেমীদের জন্য রয়েছে হোগে ভেলুভে ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে ক্রোলার-মুলার জাদুঘর। এখানে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ৮৮টি চিত্রকর্ম রয়েছে। জাদুঘরের পাশের ভাস্কর্য উদ্যানটি ইউরোপের অন্যতম বড়। সবুজ ঘাসের মাঠ ও বনের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ২০০টি শিল্পকর্ম। সাইকেলে অল্প দূরত্ব পাড়ি দিলেই পৌঁছানো যায় জাখটুইস সিন্ট হুবার্টাসে, যা একসময় ক্রোলার-মুলার পরিবারের আবাস ছিল।
শান্ত ছুটির ঠিকানা
ভেলুভে অঞ্চলে রাত কাটানোর জন্য রয়েছে বনের মধ্যে তৈরি কেবিন, হোটেল ও হলিডে পার্ক। গাছপালায় ঘেরা নিরিবিলি পরিবেশে থাকার পাশাপাশি স্থানীয় উপকরণে তৈরি খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। শরতের মৌসুমে পর্যটকের ভিড় তুলনামূলক কম থাকায় জাতীয় উদ্যানের অনেক পথেই পাওয়া যায় নির্জনতা।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে হোগে ভেলুভে ন্যাশনাল পার্কে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশমূল্য ১৩ দশমিক ৮৫ ইউরো, যা বাংলাদেশি প্রায় ১ হাজার ৯৫০ টাকা। বনের ধারের কেবিনে থাকার খরচ শুরু ১১০ ইউরো থেকে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৫ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া ক্যাম্পিং ও হোটেলে থাকারও বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।
সাইকেল চালিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা, বন্যপ্রাণী দেখা, ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘোরা কিংবা ভ্যান গঘের শিল্পকর্ম উপভোগ সব মিলিয়ে নেদারল্যান্ডসের ভেলুভে হতে পারে শরতের ছুটিতে ভিন্নধর্মী ভ্রমণের ঠিকানা।