শীত এলেই ইউরোপের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো বরফের চাদরে ঢেকে যায়। অনেক পর্যটকের কাছে এই সময়ের প্রধান আকর্ষণ স্কিইং। তবে স্কিইং না জানলেও শীতের ছুটি উপভোগ করার সুযোগ কম নেই। বরফে ঢাকা বনভূমিতে হাঁটা, কুকুরের স্লেজে চড়া, হিমায়িত হ্রদে মাছ ধরা, নর্দার্ন লাইটস দেখা কিংবা বরফের ওপর স্কেটিং এমন নানা অভিজ্ঞতার সুযোগ রয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে। স্কিইংয়ের বাইরে শীতকালীন ভ্রমণের জন্য ইউরোপের আটটি জায়গার কথা তুলে ধরা হলো-
ফিনল্যান্ডের রুকায় বরফের রাজ্যে অভিযান
ফিনল্যান্ডের ল্যাপল্যান্ড অঞ্চলের রুকা স্কিইংয়ের জন্য পরিচিত হলেও এখানে স্কিইং ছাড়াও রয়েছে নানা আয়োজন। বরফে ঢাকা বনের মধ্যে ইলেকট্রিক ফ্যাটবাইক চালানো, জমে যাওয়া হ্রদে গর্ত করে মাছ ধরা, তুষারপথে হাঁটা এবং আর্কটিক অঞ্চলে টিকে থাকার কৌশল শেখার সুযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার অন্ধকারে তুষারপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নর্দার্ন লাইটস দেখার অভিজ্ঞতাও নিতে পারেন পর্যটকেরা। রেইনডিয়ারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সান্তা ক্লজের কটেজ ঘুরে দেখাও শিশুদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ।
স্কটল্যান্ডের কেয়ারনগর্মসে তারাভরা রাত
স্কটল্যান্ডের কেয়ারনগর্মস অঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। এখানকার টমিনটুল ও গ্লেনলিভেট এলাকা আন্তর্জাতিক ডার্ক স্কাই পার্ক হিসেবে পরিচিত। দূষণমুক্ত অন্ধকার আকাশে তারার মেলা দেখার সুযোগ রয়েছে এখানে। বরফে ঢাকা পাহাড়ি পথে হাঁটা, রাতে গাইডের সঙ্গে প্রকৃতি ভ্রমণ, রেইনডিয়ার দেখা এবং পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়িতে ঘোরার অভিজ্ঞতাও নিতে পারেন পর্যটকেরা।
ফ্রান্সের শ্যামোনিতে হিমবাহ ও তুষারপথ
মঁ ব্লাঁ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত ফ্রান্সের শ্যামোনি স্কিইংয়ের জন্য বিখ্যাত। তবে স্কিইং না করেও এখানকার বরফঢাকা উপত্যকা ও পাইনবনে হাঁটার সুযোগ রয়েছে। স্নোশু পরে তুষারপথে হাইকিং, কেবল কারে চড়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে দৃশ্য দেখা এবং হিমবাহের বরফের গুহা ঘুরে দেখা যায়। শিশু ও পরিবারের জন্য রয়েছে টোবোগান স্লেজে চড়ার ব্যবস্থা। পাহাড়ি এলাকার ইতিহাস ও পর্বতারোহণের নানা স্মৃতি জানতে চাইলে ঘুরে দেখা যেতে পারে মঁ ব্লাঁ জাদুঘরও।
রোমানিয়ার ট্রান্সিলভানিয়ায় ভালুকের খোঁজে
রোমানিয়ার ট্রান্সিলভানিয়া অঞ্চল বরফে ঢাকা পাহাড়, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর জন্য পরিচিত। এখানে কার্পেথিয়ান পর্বতমালার পথে গাইডের সঙ্গে স্নোশু হাইকিং করা যায়। পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় ভালুক বা নেকড়ের পায়ের ছাপও চোখে পড়তে পারে। এ অঞ্চলে ঘোরার তালিকায় রাখা যায় ব্রাশভ শহর, ভালুক সংরক্ষণকেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক ব্রান ক্যাসল।
অস্ট্রিয়ার ইনসব্রুকে বরফের ওপর নানা আয়োজন
অস্ট্রিয়ার ইনসব্রুক শহর ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় স্কিইং ছাড়াও রয়েছে নানা শীতকালীন বিনোদন। অলিম্পিক ববস্লে ট্র্যাকে দ্রুতগতিতে স্লেজে চড়া, রাতে পাহাড়ের ঢালে স্লেজিং এবং বরফের তৈরি ইগলুতে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা নিতে পারেন পর্যটকেরা। নভেম্বর থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় ক্রিসমাস মার্কেট। এ ছাড়া ‘আইস ম্যাজিক’ নামে নতুন এক আয়োজনের মাধ্যমে আলোকসজ্জায় সাজানো বরফের পথ, আইস ডিস্কো ও সংগীতের ব্যবস্থাও থাকছে।
সুইডেনে হিমায়িত হ্রদে স্কেটিং
সুইডেনের স্টকহোম ও আশপাশের দ্বীপাঞ্চলে শীতকালে হিমায়িত হ্রদ ও সমুদ্রের ওপর স্কেটিংয়ের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ ধরনের লম্বা ব্লেডযুক্ত স্কেট পরে বরফের ওপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন পর্যটকেরা। তবে নতুনদের জন্য অভিজ্ঞ গাইডের সঙ্গে যাওয়া জরুরি। লেক মেলারেন ও স্টকহোম দ্বীপপুঞ্জে গাইডেড স্কেটিংয়ের আয়োজন রয়েছে। শহরের ভেতরেও বরফের রিঙ্কে স্কেটিং কিংবা আইস হকি ম্যাচ দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।
ইতালির ডোলোমাইটসে বরফের পথে হাঁটা ও খাবার
ইতালির ডোলোমাইটস অঞ্চল শীতকালে বরফে ঢাকা পাহাড় ও উপত্যকার জন্য মনোরম হয়ে ওঠে। এখানে স্কিইং না করেও পরিচ্ছন্ন ও চলাচলের উপযোগী পাহাড়ি পথে হাঁটা যায়। পথে পথে থাকা পাহাড়ি খাবারের দোকান বা রিফুজিওতে মিলবে স্থানীয় নানা পদ। ডাম্পলিং, পনির ও পালংশাকের পুর দেওয়া পাস্তা, মাশরুম রিসোটো এবং স্থানীয় মিষ্টি খাবারের স্বাদ নিতে পারেন পর্যটকেরা। দীর্ঘ হাঁটার পর পাহাড়ি হোটেলে সনা ও স্থানীয় খাবারের আয়োজনও ভ্রমণকে আরামদায়ক করে তোলে।
নরওয়ের ট্রমসোতে নর্দার্ন লাইটস ও কুকুরের স্লেজ
আর্কটিক সার্কেলের প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত নরওয়ের ট্রমসো নর্দার্ন লাইটস দেখার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। এখানকার আদিবাসী সামি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও রেইনডিয়ার পালনের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। রেইনডিয়ারের স্লেজে চড়া, তাদের খাবার দেওয়া এবং সামি পরিবারের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী তাঁবুতে সময় কাটানো যায়। পাশাপাশি কুকুরের স্লেজ, বরফে মাছ ধরা, ফিয়র্ডে নৌভ্রমণ এবং স্নোমোবাইল সাফারির আয়োজনও রয়েছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দেখা মিলতে পারে রঙিন নর্দার্ন লাইটসের।
স্কিইংয়ের বাইরে শীতের ইউরোপে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যে কত বৈচিত্র্যময় হতে পারে, এই আটটি গন্তব্য তারই উদাহরণ। কেউ চাইলে বরফের মধ্যে অ্যাডভেঞ্চারে মেতে উঠতে পারেন, কেউ আবার প্রকৃতি, স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের স্বাদ নিতে পারেন। ফলে স্কিইংয়ে আগ্রহ না থাকলেও ইউরোপের শীতকালীন ছুটি হতে পারে স্মরণীয়।