শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে গিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে কার না ভালো লাগে! কলকাতা ভ্রমণে গেলে শুধু শহরের দর্শনীয় স্থান ঘুরেই ফিরে আসতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। হাতে দু’দিন সময় থাকলে শহরের বাইরে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি সুন্দর গন্তব্যে ঘুরে আসতে পারেন। কোথাও নদীর পাড়ে ইতিহাসের স্মৃতি, কোথাও গ্রামবাংলার শান্ত পরিবেশ, আবার কোথাও শালবনের সবুজ হাতছানি। বাংলাদেশ থেকে কলকাতা বেড়াতে যাওয়া পর্যটকেরাও চাইলে এই জায়গাগুলো ভ্রমণতালিকায় রাখতে পারেন। রইল পাঁচটি গন্তব্যের খোঁজ।
জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ: ইতিহাস আর নদীর হাতছানি
মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জ ও আজিমগঞ্জ ভাগীরথী নদীর দুই পাড়ে অবস্থিত। নবাবি ইতিহাসের পাশাপাশি এই দুই শহরে ছড়িয়ে রয়েছে জৈন মন্দির, পুরনো প্রাসাদোপম বাড়ি এবং টেরাকোটার মন্দির। কাছেই বড়নগর। সেখানে রয়েছে রানি ভবানীর তৈরি একাধিক মন্দির। বিশেষ করে চার বাংলা মন্দিরের টেরাকোটার কারুকাজ পর্যটকদের নজর কাড়ে। মন্দিরের গায়ে রামায়ণ-মহাভারতের নানা দৃশ্যের পাশাপাশি ফুটে উঠেছে তৎকালীন সমাজজীবনের ছবি।
এ ছাড়া কাঠগোলা প্যালেস, জৈন মন্দির এবং স্থানীয় তাঁতশিল্প ঘুরে দেখতে পারেন। মুর্শিদাবাদের সিল্ক ও গরদের শাড়ি তৈরির কাজ কাছ থেকে দেখার সুযোগও মিলবে।
থাকার ব্যবস্থা: জিয়াগঞ্জ ও আজিমগঞ্জে কয়েকটি হোটেল রয়েছে। তবে থাকার জায়গার সংখ্যা তুলনামূলক কম, তাই আগে থেকে বুকিং করে নেওয়া ভালো।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতে যাওয়া যায়। ট্রেনে হাওড়া থেকে আজিমগঞ্জ অথবা শিয়ালদহ থেকে জিয়াগঞ্জ পৌঁছানো সম্ভব।
আসাননগর: গ্রামবাংলার নিরিবিলি পরিবেশ
নদিয়ার কৃষ্ণনগরের কাছে ছোট্ট গ্রাম আসাননগর। শহরের কোলাহল থেকে দূরে দু’দিন নিরিবিলিতে কাটাতে চাইলে জায়গাটি পছন্দ হতে পারে। চারপাশে সবুজ প্রকৃতি, মেঠো পথ আর গ্রামের শান্ত পরিবেশ সব মিলিয়ে এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। এখানকার পরিচিতি বাউল-ফকির পরম্পরার জন্যও। শীতকালে এখানে লালন মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে দুই বাংলার বাউল ও ফকিরেরা অংশ নেন।
আসাননগরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলধারা এবং গ্রামের আলপথ ধরে হাঁটতে পারেন। শহুরে ব্যস্ততা থেকে বিরতি নিয়ে প্রকৃতির কাছে সময় কাটানোর জন্য এটি ভালো গন্তব্য। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। সড়কপথে যেতে চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা লাগতে পারে।
থাকার ব্যবস্থা: আসাননগরে থাকার জায়গা সীমিত। একটি বেসরকারি অতিথিনিবাস রয়েছে বলে জানা যায়। যাওয়ার আগে বুকিং ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নিন।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ট্রেনে কৃষ্ণনগর গিয়ে সেখান থেকে অটো বা গাড়ি ভাড়া করে আসাননগর পৌঁছানো যায়। সরাসরি গাড়িতেও যাওয়া সম্ভব।
শান্তিপুর: তাঁতশিল্প ও ইতিহাসের টানে
নদিয়ার শান্তিপুরের পরিচিতি মূলত তাঁতশিল্প, রাস উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের জন্য। তবে উৎসবের সময় ছাড়াও শহরটি ঘুরে দেখার মতো। এখানে রয়েছে শ্যামচাঁদ মন্দির, তোপখানার মসজিদ, অদ্বৈতপীঠ, আগমেশ্বরী মন্দির এবং জলেশ্বরের শিবমন্দির। পুরনো বাড়ি ও মন্দিরের স্থাপত্যে বাংলার ইতিহাসের নানা চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়।
শান্তিপুরে গেলে তাঁতিপাড়ায় ঘুরে দেখতে ভুলবেন না। যে শাড়ি দোকানে সাজানো অবস্থায় দেখেন, তার পেছনে তাঁতিদের কতটা পরিশ্রম থাকে, তা কাছ থেকে জানার সুযোগ মিলবে। স্থানীয় তাঁতের শাড়ি কেনাকাটাও করতে পারেন। সময় থাকলে ইছামতীর পাড়ে বনগাঁর মঙ্গলগঞ্জের নীলকুঠিও ঘুরে দেখতে পারেন।
থাকার ব্যবস্থা: শান্তিপুরে নদীর ধারে কয়েকটি রিসর্ট ও থাকার জায়গা রয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরোয়া খাবারের ব্যবস্থাও মেলে।
কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুরগামী ট্রেন পাওয়া যায়। কলকাতা থেকে সড়কপথেও যাওয়া সম্ভব।
হাতিবাড়ি: শালবন ও সুবর্ণরেখার সৌন্দর্য
প্রকৃতি ও অরণ্য ভালোবাসলে ঝাড়গ্রামের হাতিবাড়ি হতে পারে পছন্দের গন্তব্য। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের সংযোগস্থলের কাছাকাছি এই এলাকায় রয়েছে শালবন, নদী এবং নিরিবিলি পরিবেশ। হাতির চলাচলের করিডর থাকায় কখনও বন্য হাতির দেখাও মিলতে পারে। তবে বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
আশপাশে ঘুরে দেখতে পারেন চিল্কিগড়ের প্রাচীন রাজবাড়ি ও কনকদুর্গা মন্দির। সবুজের মাঝে সময় কাটানোর পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
থাকার ব্যবস্থা: বনোন্নয়ন নিগমের অতিথি আবাস রয়েছে। আগে থেকে বুকিং ও যাতায়াতের ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ট্রেনে ঝাড়গ্রাম পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে হাতিবাড়ি যাওয়া যায়। ঝাড়গ্রাম থেকে গোপীবল্লভপুর হয়ে সড়কপথে হাতিবাড়ি পৌঁছানো সম্ভব।
জয়পুর: অরণ্যের পথে সবুজের সন্ধান
রাজস্থান নয়, এই জয়পুর বাঁকুড়া জেলার। জয়পুর অরণ্য শাল, মহুয়া, সেগুন-সহ নানা গাছের সমাহারে ঘেরা। অরণ্যের বুক চিরে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাই আলাদা। পাখিপ্রেমীদের জন্যও জায়গাটি আকর্ষণীয়। এখানে নানা প্রজাতির পাখির দেখা মেলে।
জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে পরিত্যক্ত একটি বিমানঘাঁটি, যা বাসুদেবপুর চাতাল নামেও পরিচিত। স্থানীয়ভাবে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত হতো বলে শোনা যায়। জয়পুর ঘুরে চাইলে বিষ্ণুপুরেও যেতে পারেন। সেখানকার টেরাকোটার মন্দির বাংলার স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন।
থাকার ব্যবস্থা: জয়পুর অরণ্যের আশপাশে এবং বিষ্ণুপুরে বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসর্ট রয়েছে।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে সড়কপথে ডানকুনি ও আরামবাগ হয়ে জয়পুর পৌঁছানো যায়। ট্রেনে গেলে বিষ্ণুপুর স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে অরণ্যে যেতে পারেন।
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য কিছু পরামর্শ
এই পাঁচটি জায়গায় ঘুরতে চাইলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে সফরের পরিকল্পনা করুন। তবে সব গন্তব্য একসঙ্গে দু’দিনে ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। প্রতিটি জায়গার জন্য আলাদা করে দু’দিনের পরিকল্পনা করাই ভালো। বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার আগে ভারতীয় ভিসা, নির্ধারিত প্রবেশপথ এবং ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন যাচাই করে নিন। ট্রেনের টিকিট, হোটেল ও স্থানীয় যাতায়াতের ব্যবস্থা আগেই নিশ্চিত করুন। প্রত্যন্ত এলাকায় গেলে নগদ টাকা সঙ্গে রাখুন এবং ফেরার পরিবহনের সময়সূচি জেনে নিন।