কক্সবাজারের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলির বাইরে একটু অন্য রকম পরিবেশ খুঁজছেন? তা হলে ঘুরে আসতে পারেন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে। সাবরাং ইউনিয়নের অন্তর্গত এই জনপদ একসময় চারদিকে জলবেষ্টিত ছিল। পরে ভৌগোলিক পরিবর্তনের ফলে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার।
শাহপরীর দ্বীপের দৃশ্যপট বেশ আলাদা। দ্বীপের এক পাশে বয়ে চলেছে নাফ নদী। নদীর ওপারেই মায়ানমার। দূরে পাহাড়ের সারি, বিস্তৃত সমুদ্র আর উপকূলের গ্রামীণ জীবন। স্থানীয়দের মুখে দ্বীপের নামকরণ নিয়েও নানা কাহিনি শোনা যায়। প্রচলিত একটি মত অনুযায়ী, শাহ সুজার স্ত্রী পরীবানুর নামের ‘পরী’ এবং শাহ সুজার ‘শাহ’ মিলিয়ে হয়েছে শাহপরী। আবার অনেকে মনে করেন, সুফি সাধক শাহ ফরিদের নাম থেকেই দ্বীপের নামকরণ।
নির্জন সৈকত ও সমুদ্রের রূপ
শাহপরীর দ্বীপে রয়েছে একাধিক সৈকত। সেখান থেকে দেখা যায় সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশি। নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটাতে চাইলে যেতে পারেন গোলার চরেও। পূর্ণিমার রাতে জোছনায় ভেসে ওঠা এই এলাকার সৌন্দর্য আলাদা করে নজর কাড়ে। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে দূরে মায়ানমারের মঙডু অঞ্চলের পাহাড়ও চোখে পড়ে। দেখা যায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দিকটিও।
এখানকার উপকূলের আর একটি আকর্ষণ জেলেপাড়া। ছোট ছোট ঘর, মাছ ধরার নৌকা আর সমুদ্রনির্ভর মানুষের দৈনন্দিন জীবন কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে সেখানে। সাগরের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই করেই জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয় জেলেরা। তাদের জীবনযাত্রা পর্যটকের কাছে এই জনপদের অন্য এক পরিচয় তুলে ধরে।
লবণক্ষেত আর পাখির আনাগোনা
জেলেপাড়ার কাছেই রয়েছে বিস্তীর্ণ লবণক্ষেত। দূর থেকে তাকালে সাদা লবণের মাঠের সঙ্গে আকাশ ও সমুদ্রের মিতালি চোখে পড়ে। লবণ তৈরির কাজে ব্যবহৃত ছোট ছোট জলপথে জোয়ারের সময় নোনা জল ঢুকে পড়ে। এসব জলপথের আশপাশে খাবারের খোঁজে ভিড় করে গাঙচিল, সারসসহ নানা পাখি। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এই দৃশ্যও হতে পারে বাড়তি পাওনা।
জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি কখনও কখনও রাস্তার কাছাকাছি চলে আসে। উপকূলের গাছপালার গোড়া পানিতে ডুবে থাকার দৃশ্যও দেখা যায়। তবে সৈকতগুলিতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ডের ব্যবস্থা নেই। তাই সমুদ্রে নামার আগে স্থানীয়দের কাছ থেকে জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিন।
পথে দেখে নিতে পারেন টেকনাফ
শাহপরীর দ্বীপে যাওয়ার পথে টেকনাফের কয়েকটি জায়গাও ঘুরে দেখতে পারেন। স্থানীয় আদিবাসী জনপদ, পাহাড়ি গুহা এবং মাথিনের কূপের মতো স্থান সম্পর্কে খোঁজ নিতে পারেন। তবে সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ মেনে চলা জরুরি।
কোথায় থাকবেন
শাহপরীর দ্বীপে থাকার জায়গা সীমিত। তাই থাকার পরিকল্পনা আগে থেকে করে নেওয়া ভাল। টেকনাফে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল নে টং-এ থাকতে পারেন। সেখানে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দ্বৈত কক্ষের ভাড়া ১,৯০০ টাকা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্যুইটের ভাড়া ৩,১০০ টাকা এবং সাধারণ দ্বৈত কক্ষের ভাড়া ১,৩০০ টাকা। টেকনাফ শহরের সাধারণ মানের হোটেলগুলিতে ৩০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে কক্ষ পাওয়া যেতে পারে। তবে মৌসুম, চাহিদা ও হোটেলভেদে ভাড়া বদলাতে পারে। দ্বীপে তাঁবুতে থাকার কথা ভাবলে আগে স্থানীয়ভাবে অনুমতি, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফগামী বাসে যাওয়া যায়। সেন্ট মার্টিন সার্ভিসের হিনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়া ১,১৫০ টাকা। শ্যামলী, এস আলম, সৌদিয়া ও হানিফসহ কয়েকটি পরিবহনের সাধারণ বাসেও টেকনাফ যাওয়া যায়। এসব বাসের ভাড়া ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। বাসের ধরন ও সময় অনুযায়ী ভাড়া পরিবর্তিত হতে পারে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার গিয়েও টেকনাফ পৌঁছনো যায়। কক্সবাজার শহরের আন্তজেলা বাস টার্মিনাল থেকে টেকনাফগামী বাস ছাড়ে। বাসভাড়া ১২০ থেকে ২৫০ টাকা। এ ছাড়া কলাতলী ও টেকনাফ বাইপাস মোড় এলাকা থেকে মাইক্রোবাসও পাওয়া যায়। সেখান থেকে টেকনাফ পৌঁছে স্থানীয় যানবাহনে শাহপরীর দ্বীপে যেতে হবে।
সমুদ্র, নদী, পাহাড় আর উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা মিলিয়ে শাহপরীর দ্বীপ এমন এক গন্তব্য, যেখানে শুধু বেড়ানো নয়, দেখা মিলবে বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের এক ভিন্ন ভূপ্রকৃতি ও জীবনধারার।