বরফে ঢাকা পাহাড়, জমে যাওয়া হ্রদ, তুষারপাত আর রাতের আকাশে রঙিন আলোর খেলা যেন স্বপ্নে দেখা দেশ। শীতকালীন এমন সুন্দর ও ভিন্ন অভিজ্ঞতা মিলবে সুইডেনের ল্যাপল্যান্ডে। তাই শীতের দেশে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা থাকলে সুইডেনের ল্যাপল্যান্ড হতে পারে অন্যরকম এক গন্তব্য। সব মিলিয়ে এখানকার শীতকালীন প্রকৃতি একেবারেই আলাদা। বিশেষ করে ল্যাপল্যান্ডের ছোট্ট গ্রাম আবিস্কো মেরুজ্যোতি বা নর্দার্ন লাইটস দেখার অন্যতম নির্ভরযোগ্য জায়গা হিসেবে পরিচিত।
সেখানে দিনের আলো এতটাই কম থাকে যে সকাল ও বিকালের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। সূর্য দিগন্তের ওপরে না উঠলেও আকাশে গোলাপি, কমলা ও নীলচে আলোর আভা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থায়ী হয়। ফলে সময়ের চেনা হিসাবও যেন বদলে যায়।
লন্ডন থেকে আবিস্কোয় পৌঁছানোর যাত্রাপথে দেখা মিলবে প্রকৃতির অপূর্ব সুন্দর রূপ। ‘আবিস্কো ব্লু হোল’ নামে পরিচিত একটি ক্ষুদ্র জলবায়ু অঞ্চলের কারণে আশপাশের এলাকার তুলনায় এখানে আকাশ অনেক সময় পরিষ্কার থাকে। তাই মেরুজ্যোতি দেখার সম্ভাবনাও বেশি।
গ্রামে পৌঁছে চারদিকে বরফে ঢাকা সাদা প্রকৃতি চোখে পড়ে। তুষারপাতের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারের জায়গায় গেলে বরফে ঢাকা পথ, গাছের সারি আর দ্রুত নেমে আসা অন্ধকারসহ দেখতে পাবেন প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপ।
আবিস্কোয় ছুটির অন্যতম আকর্ষণ নর্দার্ন লাইটস। কোনও এক সন্ধ্যায় দেখতে পারেন আকাশে মেরুজ্যোতি। বাইরে বেরিয়ে বরফের ওপর দাঁড়িয়ে অথবা আরও উঁচু কোনও জায়গায় গিয়ে উপভোগ করতে পারবেন সবুজ আলোর নাচ।
দিনে তুষারঢাকা লেক টর্নেট্রাস্কের পাড় ধরে কয়েক ঘণ্টা হাঁটলে পথের দু’পাশে রুপালি বার্চগাছ, বরফে ঢাকা ডালপালা আর নির্জন প্রকৃতির দেখা মিলবে। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাবেন জমে যাওয়া একটি জলপ্রপাতের কাছে। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে উঁচু একটি জায়গা থেকে দিগন্তের দিকে তাকান। সূর্য না উঠলেও আকাশে সূর্যোদয়ের মতো কমলা ও গোলাপি আভা ছড়িয়ে থাকা উপভোগ করতে পারবেন। কয়েক ঘণ্টা পরেও সেই আলোর রং প্রায় একই রকম থাকায় সকাল না বিকেল, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
শীতের দীর্ঘ অন্ধকারে শরীর গরম রাখতে সওনা বা বাষ্পস্নানসহ স্থানীয় খাবারের স্বাদও নিতে পারবেন। স্থানীয় খাবারের মধ্যে আচার দেওয়া হেরিং মাছ, রাইয়ের রুটি, ক্লাউডবেরি জ্যাম এবং রেইনডিয়ারের মাংসের স্যুপ খুব জনপ্রিয়। স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সামি জনগোষ্ঠীর তাঁবুর আদলে তৈরি একটি ঘরে আগুনের পাশে বসে স্যুপ খাওয়ার অভিজ্ঞতা ভ্রমণে বিশেষ মাত্রা যোগ করবে।
আরেক এক সন্ধ্যায় আবিস্কো স্কাই স্টেশনে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯০০ মিটার উঁচু পাহাড়ি এই পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে কেবল কারে যাওয়া যাবে। তবে প্রবল বাতাসের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে কেবল কার চলাচল বন্ধ থাকতে পারে। সেটা খোঁজ নিয়ে কেবল কারে যাওয়ার উদ্দেশে বের হবেন।
মেরুজ্যোতি ঘিরে সামি জনগোষ্ঠীর নানা লোককথা রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাসের একটিতে বলা হয়, আকাশের এই আলো আসলে পূর্বপুরুষদের নাচের প্রতিফলন। আরেকটি গল্পে এক শিয়ালকে আকাশের মধ্যে ছুটে যেতে দেখা যায়, তার লেজ থেকে ঝরে পড়ে বরফের কণা। পাশাপাশি মেরুজ্যোতি দেখার পূর্বাভাস জানতে কয়েকটি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
আবিস্কোর এই ভ্রমণ শুধু মেরুজ্যোতি দেখার অভিজ্ঞতা নয়, বরং দিনের আলো কমে যাওয়ায় সময়কে নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে দেবে। কখন সকাল, কখন বিকাল কিংবা সন্ধ্যা—তার হিসাব না রেখে বরফে ঢাকা প্রকৃতি, হ্রদ, জলপ্রপাত ও আকাশের আলোর খেলা উপভোগ করাই হয়ে উঠবে ছুটির মূল আনন্দ।