ছয় মাসের জন্য ঢুকে আকাশেই কাটিয়ে দিলেন ৬৩ বছর!

মাত্র ছয় মাসের জন্য বিমানসেবিকার চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, তারপর বিয়ে করে সংসার পাতবেন। কিন্তু সেই সাময়িক চাকরিই হয়ে উঠল জীবনের দীর্ঘতম অধ্যায়। এক-দু’বছর নয়, টানা ৬৩ বছর আকাশপথে যাত্রীদের সঙ্গ দিয়েছেন তিনি। অবশেষে ৮৩ বছর বয়সে শেষ ফ্লাইটে চড়ে কর্মজীবনে ইতি টানলেন আমেরিকান এয়ারলাইন্সের প্রবীণতম বিমানসেবিকা ক্যারল ফেয়ার। তার বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিমানবন্দরে আয়োজন করা হয়েছিল বিশেষ সংবর্ধনার।

বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে হাজির হয়েছিলেন বহু মানুষ। এমনকি তার সম্মানে আয়োজন করা হয়েছিল পানি দিয়ে বিশেষ অভিবাদন জানানোর অনুষ্ঠান, যা সাধারণত বিমান সংস্থার ক্ষেত্রে দেখা গেলেও কোনও বিমানসেবিকার বিদায়ের সময় এমন আয়োজন বিরল।

গত ২৬ অক্টোবর লন্ডন থেকে আমেরিকার নর্থ ক্যারোলাইনার শার্লটগামী আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ৭৩৩ নম্বর ফ্লাইটে শেষবারের মতো দায়িত্ব পালন করেন ক্যারল। এর মাধ্যমেই শেষ হয় তার দীর্ঘ ৬৩ বছরের কর্মজীবন। শার্লট ডগলাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার অবসর উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিমানসেবিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ক্যারল। প্রথম চাকরি পান পিডমন্ট এয়ারলাইন্সে। তবে তার আগে আমেরিকান এয়ারলাইন্সে চাকরির আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। ‘ফোর্বস’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যারল জানান, তখন তাকে বলা হয়েছিল, তিনি নাকি ওই সংস্থার উপযুক্ত নন।

প্রথম দিকে ভেবেছিলেন, মাত্র ছয় মাস এই কাজ করবেন। তারপর বিয়ে করে সংসার শুরু করবেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় পরিকল্পনা। যে কাজকে সাময়িক পেশা ভেবেছিলেন, সেটিই হয়ে ওঠে তার আজীবনের সঙ্গী।

১৯৮৭ সালের ১৫ জুন পিডমন্ট এয়ারলাইন্সের শার্লট থেকে লন্ডনগামী প্রথম ফ্লাইটেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন ক্যারল। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের মানচিত্রে শার্লটের গুরুত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে সেই ফ্লাইট ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ যাত্রায় সেই পথেরই একাংশ আবার পাড়ি দেন তিনি।

২০০৮ সালে নর্থ ক্যারোলাইনার পরিবহণ ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মান জানাতে তৈরি এক বিশেষ সম্মাননার তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। অবসরের সময় আমেরিকান এয়ারলাইন্সের প্রায় ৩০ হাজার কর্মীর মধ্যে জ্যেষ্ঠতার নিরিখে শীর্ষে ছিলেন ক্যারল।

কর্মজীবনের শুরুর দিকে ছোট বিমানে কাজ করতেন। পরে বড় আকারের বোয়িং বিমানে কাজ করার সুযোগ পান। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ক্যারল জানিয়েছিলেন, ডিসি-৩ বিমান থেকে বোয়িং ৭৬৭-তে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে আগের রাতে ঘুমোতেই পারেননি। তার কাছে সেই অভিজ্ঞতা ছিল স্বপ্নপূরণের মতো।

দীর্ঘ কর্মজীবনের ইতি টানার দিন ক্যারলকে বিশেষভাবে সম্মান জানায় আমেরিকান এয়ারলাইন্স। মাথায় মুকুট, গলায় সম্মানসূচক ফিতা এবং হাতে বেলুনের তোড়া নিয়ে তাকে দেখা যায় বিদায় অনুষ্ঠানে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন ছিল পানি দিয়ে অভিবাদন জানানো। সাধারণত কোনও বিমান সংস্থার নতুন বিমান বা বিশেষ ফ্লাইটকে স্বাগত জানাতে এই আয়োজন করা হয়। তবে কোনও বিমানসেবিকার অবসরের সময় এমন সম্মান সচরাচর দেখা যায় না।

অবসরের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে ক্যারল জানান, এবার থামার সময় হয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি উপভোগ করেছেন। প্রায় ৩০ হাজার কর্মীর মধ্যে জ্যেষ্ঠতার নিরিখে প্রথম স্থানে পৌঁছনোর পর আর উপরে ওঠার সুযোগ নেই বলেই এবার বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

৬৩ বছরের দীর্ঘ আকাশযাত্রা শেষ হলেও বিমান চলাচলের ইতিহাসে নিজের জন্য বিশেষ জায়গা তৈরি করে গেলেন ক্যারল ফেয়ার।