ইতিহাস-নাইটলাইফে জমজমাট বেলগ্রেড, ঘুরে দেখুন সার্বিয়ার রাজধানী

ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন শহর বেলগ্রেড। সাভা ও দানিয়ুব দুই নদীর সঙ্গমস্থলে গড়ে ওঠা সার্বিয়ার রাজধানীটি যেন ইতিহাস আর আধুনিকতার এক আশ্চর্য মিলনমেলা। পুরনো স্থাপত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, জমজমাট ক্যাফে, খাবারের বাজার আর রাতভর খোলা বারের কারণে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে শহরটি।

গত প্রায় দু’বছর ধরে ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে বেলগ্রেড। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ভেঙে ১৬ জনের মৃত্যুর পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন জোরদার হয়। সম্প্রতি নির্বাচনে ছাত্রসমর্থিত জোটের জয় শহরের রাজনৈতিক আবহে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই পরিবর্তনের আবহেই বেলগ্রেডের রেস্তরাঁ, বাজার, নদীতীর ও নাইটলাইফ ঘুরে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন শহরের বাসিন্দা ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত ড্রাগানা কোস্তিকা।

পুরনো শহরের অলিগলি ও শিল্পের টান

বেলগ্রেড ঘোরার শুরু হতে পারে পুরনো শহর থেকে। ডোরচল এলাকার ঐতিহাসিক বাড়ি ও পুরনো কারখানার জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে স্বাধীন আর্ট গ্যালারি, বিশেষ কফিশপ, বার ও আধুনিক রেস্তরাঁ। দেওয়ালে গ্রাফিতি, নানা প্রদর্শনী ও সংগীতের আয়োজনের কারণে এলাকাটিতে সারা বছরই প্রাণচাঞ্চল্য থাকে। পাথর বাঁধানো রাস্তা আর ক্যাফের পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন কোসানচিচেভ ভেনাচ এলাকায়। সাভা নদীর ধারে সাভামালা অঞ্চলের বেটন হালায় রয়েছে নদীমুখী রেস্তরাঁও।

ইতিহাস ও শিল্পকলায় আগ্রহ থাকলে ঘুরে দেখতে পারেন ন্যাশনাল মিউজিয়াম। প্রাগৈতিহাসিক যুগের নিদর্শন থেকে রোমান সভ্যতার সামগ্রী, সার্বিয়া ও ইউরোপের চিত্রকলা বিভিন্ন সময়ের সংগ্রহ রয়েছে এখানে। সমকালীন শিল্পের জন্য যেতে পারেন মিউজিয়াম অব কনটেম্পোরারি আর্টে। ১৯৬৫ সালে তৈরি আধুনিক স্থাপত্যের এই ভবনটি নিজেই দর্শনীয়। স্থানীয় শিল্পী ও ডিজাইনারদের কাজ দেখতে যেতে পারেন গ্যালেরিয়া কুলাতেও।

বাজারে মিলবে স্থানীয় জীবনের স্বাদ

শহরের দৈনন্দিন জীবন কাছ থেকে দেখতে চাইলে ঘুরে আসুন জেমুন, কালেনিচ ও পালিলুলা খাবারের বাজারে। সেখানে স্থানীয় খাবার, তাজা উপকরণ, রাস্তার ধারের খাবারের দোকান—সবই মিলবে। সার্বিয়ার জনপ্রিয় খাবার ‘চেভাপি’—কাবাবের মতো মাংসের পদ—চেখে দেখতে পারেন। এ ছাড়া রয়েছে ভাজা মাংস, স্থানীয় রুটি ও নানা ধরনের মিষ্টি।

কী খাবেন, কোথায় খাবেন

ঐতিহ্যবাহী সার্বীয় খাবারের স্বাদ নিতে যেতে পারেন স্তারা হেরৎসেগোভিনা রেস্তরাঁয়। সেখানে মাংসের পদ, ঘন স্যুপ এবং টমেটো, শসা, মরিচ ও সাদা পনির দিয়ে তৈরি স্থানীয় সালাদ পাওয়া যায়। মিষ্টি হিসেবে রয়েছে আখরোটে ভরা সেদ্ধ আপেল ও ডাম্পলিং।

বালকান অঞ্চলের খাবারে আধুনিক ছোঁয়া পেতে পারেন দ্রাগোলিউবে। অন্য দিকে, ন্যাশনাল থিয়েটারের কাছে কোঅর্ডিনাটা রেস্তরাঁয় স্থানীয় খামারের উপকরণ দিয়ে তৈরি নানা পদ পরিবেশন করা হয়। জর্জিয়ান খাবার চেখে দেখতে চাইলে যেতে পারেন স্টোরিজে। সেখানে ‘খিনকালি’ নামে পুরভরা ডাম্পলিং এবং পনিরে ভরা রুটি ‘খাচাপুরি’ বিশেষ জনপ্রিয়।

ককটেল ও হালকা খাবারের জন্য রয়েছে ছোট্ট বার চিলিম। আর ওয়াইন পছন্দ হলে পুরনো শহরের অলিভার্সে ঢুঁ মারতে পারেন।

রাত জাগে বেলগ্রেড

বেলগ্রেডের নাইটলাইফের অন্যতম আকর্ষণ ইলেকট্রনিক সংগীত। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই শহরে ডিজে ও ক্লাব সংস্কৃতি জনপ্রিয়। রেট্রো যুগোস্লাভ নকশার সাজে তৈরি এসথেটিক জয়েস এম্বাসিতে জাপানি খাবারের সঙ্গে উপভোগ করতে পারেন ডিজে-র সংগীত। শহরের কেন্দ্রে পুরনো একটি শপিং সেন্টারের ভিতরে রয়েছে ককটেল ও ডিজে বার বিফে। আর রাতভর নাচের পরিকল্পনা থাকলে যেতে পারেন কারমাকোমায়। সেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডিজেদের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীরাও সংগীত পরিবেশন করেন।

কোথায় থাকবেন, কী ভাবে ঘুরবেন

ডোরচল এলাকায় থাকার জন্য রয়েছে প্যাভিলিয়ন হোটেল অ্যান্ড সোশ্যাল ক্লাব। সেখানে এক রাতের জন্য ডাবল রুমের ভাড়া শুরু প্রায় ৮৯ ইউরো থেকে। শহরের কেন্দ্রে ঐতিহাসিক পরিবেশে থাকতে চাইলে বেছে নিতে পারেন হোটেল বালকান। ১৮৬০ সালে এই হোটেলের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে দেখা যায় ১৯৩৬ সালে তৈরি ভবনটি। এখানে ডাবল রুমের ভাড়া শুরু প্রায় ১০০ ইউরো থেকে।

বেলগ্রেডের একটি সুবিধা হল, শহরের বাস, ট্রাম ও ট্রলিবাসে যাতায়াত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। যদিও সেখানে এখনও মেট্রো পরিষেবা নেই, তবে গণপরিবহণের সঙ্গে পায়ে হেঁটে শহর ঘুরে দেখাই সবচেয়ে ভালো উপায়। রাস্তার শিল্পকর্ম, পুরনো বাড়ি, নদীর ধারের ক্যাফে কিংবা ব্যস্ত বাজার—সব মিলিয়ে বেলগ্রেডের আসল রূপ ধরা দেবে পথ চলতে চলতেই।