সত্যি বলতে আমার কোনও অনুভূতিই ছিল না। কোনও শক্তিই যেন পাচ্ছিলাম না। বৃষ্টিমেদুর দিনে সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখছি, বস্তুত এর চেয়ে ঠিক ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত ছিল তাশি লাপচার সেইসব দিন।
কয়েকদিন আগেই আমার জীবনতীর্থ হিমালয় থেকে ফিরেছি। হিমালয় আমাকে টানে, তাই কারণে-অকারণে সেখানে ছুটে যেতে চাই। যাওয়া বললে ভুল হবে, এ যেন এক অদৃশ্য সুতোর টানে ছুটে যাওয়া। আমাদের এবারের অভিযান ছিল ৬ হাজার ১৮৭ মিটার উঁচু মাউন্ট ফারচামো ও ৫ হাজার ৭৫৭ মিটার উঁচু তাশি লাপচা। বিএমটিসির এবারের দলে দু’বারের এভারেস্ট আরোহী এম এ মুহিতের নেতৃত্বে আমার পাশাপাশি ছিল শায়লা বীথি ও রিয়াসাদ সানভী।
দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে হিমালয়ে ৮ হাজার মিটারসহ অসংখ্য পর্বত শিখর অভিযান করা বিএমটিসি এবারের লক্ষ্য হিসেবে একটি পাস বেছে নেয়। সেটি হলো তাশি লাপচা, যা রোলওয়ালিং ও সলোখুম্বু অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে। আর তাশি লাপচার ঠিক মাথার মুকুট হওয়ায় ফারচামো অভিযানের লক্ষ্য ছিল দুটি। সেন্ট্রাল হিমালয়ে উচ্চতা, দুর্গমতা ও আরোহণ কঠিনত্ব বিবেচনায় মাকালু বরুণ অঞ্চলের শেরপেনি কোলের পরেই ধরা হয় তাশি লাপচাকে।
বিএমটিসির টিম তাশি লাপচা ও ফারচামোর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ে গত ২১ মে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে কাঠমান্ডু থেকে আমরা রোলওয়ালিংয়ের গঙ্গুর থেকে ট্রেক শুরু করি ২৫ মে। প্রথম দিন সিমিগাও, দ্বিতীয় দিন ডঙ্গং, তৃতীয় দিন বেদিং ও চতুর্থ দিনে না-গ্রামে পৌঁছাই। প্রায় ৪ হাজার ২০০ মিটার উঁচু গ্রামটিতে এক্লেমাটাইজের জন্য একরাত কাটাতে হয়।
সেন্ট্রাল হিমালয়ের অন্যান্য অঞ্চল যেমন, সলোখুম্বু বা অন্নপূর্ণার মতো রোলওয়ালিং ভ্যালিতে ট্রেকারদের অতটা আনাগোনা নেই। প্রকৃতির নিভৃত অপার কোলে এখানে আছে অ্যাডভেঞ্চারের পসরা। চো রোলপা লেকের ধারে চুকিমায় ক্যাম্পিং শুরু করি আমরা। রাত কাটে লোয়ার জাবুকে। এদিন টানা দশ ঘণ্টা গ্লেসিয়ারের ওপর ট্রেকিং করতে হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দ্রুত গলে যাওয়ায় ট্র্যাকারডিঙ গ্লেসিয়ারে পথ হারিয়ে এদিন নতুন পথ তৈরি করে ক্যাম্প সাইটে পৌঁছাতে হয় আমাদের। শেষ অংশ অতিক্রমের সময় শুরু হয়ে গিয়েছিল তুষারপাত।
পরদিন তৈরি হয় আরও বড় চ্যালেঞ্জ। কয়েকশ’ মিটারের পাথুরে খাড়া দেয়াল বেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আরোহণ করতে হয়েছে। আমরা উঠে যাই ড্রোলামবু গ্লেসিয়ারের বুকে। তারপর গ্লেসিয়ার মোরেইনের উচুঁ-নিচু বুকে একটানা চলা। কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় দুপুরের পর থেকে আবহাওয়া রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। একটানা তুষারপাত চলে। এর মধ্যেই বিএমটিসি টিম পথচলা অব্যাহত রাখে। কারণ এদিন পাস অতিক্রম করার কথা ছিল। কিন্তু পথের দুর্গমতা ও তুষারপাতের কারণে পাসের খাড়া দেয়ালের নিচে গ্লেসিয়ারের বুকেই মিডল ক্যাম্প করার সিদ্ধান্ত নেন দলনেতা এম এ মুহিত। সেটি ছিল প্রায় ৫ হাজার ৩০০ মিটার উচ্চতায়।
পরের দিনের শুরুতেই শক্ত নীল বরফের দেয়ালে ফিক্সড রোপে আরোহণ করে বিএমটিসি টিম তাশি লাপচা পাসের পথে একটি আইসফিল্ডে উঠে আসে। কিছুদূর যেতেই আবারও ভার্টিক্যাল স্লোপে রোপ ফিক্সড করতে হয়। তখন আবহাওয়া আগের দিনগুলোর মতো প্রতিকূল হয়ে পড়ে। তুষারপাতের সঙ্গে শুরু হয়ে একটানা বইতে থাকে তীব্র বাতাস। পাসের কাছাকাছি চলে আসার সময় হোয়াইট আউটে দৃষ্টিসীমা সাত-আট হাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
পরদিন ফিক্সড রোপ লাগানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পাস পেরোনোর সময় আগের দিনগুলোর ধারাবাহিকতায় আবহাওয়া আবারও রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। এমন প্রতিকূল অবস্থা অব্যাহত থাকে পরবর্তী দুই দিন। অভিযানের রসদ হিসাব করে আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় দু’পাশের সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্রাম রোলওয়ালিংয়ের না ও সলোখুম্বুর থ্যাংবায় গিয়ে রসদ নিয়ে আসা ছিল অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে ফারচামো অভিযান বাতিল করতে হয়। তবে আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলাম। অক্সিমিটারে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা চার অভিযাত্রীরই গড়ে আশির ওপরে দেখা গেছে পরীক্ষায়।
শেষ বিকালে আমরা পৌঁছাই সলোখুম্বুর অন্যতম শেরপা বসতি থামেতে। আমরা থাকি বিশ্বরেকর্ডধারী শেরপা আপা শেরপার লজে। এরপর নামচে বাজার, ফাকদিন হয়ে লুকলাতে যাই। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে লুকোচরি খেলে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় লুকলাতে একদিন প্রতিকূল আবহাওয়া আটকে রেখেছিল আমাদের।
ছবি: এম এ মুহিত