রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতুরাঙামাটির প্রতি দিনে দিনে আগ্রহ হারাচ্ছেন পর্যটকরা। ভালো মানের হোটেল-রেস্তোরাঁ, কাপ্তাই হ্রদে ওয়াটার বাইক, পাহাড়ে ক্যাবল কার, বিকল্প যানবাহনসহ কোনও সুবিধাই নেই এই জেলায়। এখানকার পর্যটন ব্যবসা ঝুলে আছে এক ঝুলন্ত সেতুতেই। সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য, স্থানীয় উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারের দায়িত্বশীলরা পরিকল্পনার বৃত্তে আটকে থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি পর্যটন খাতে।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ সৃষ্টির পর হ্রদকে পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে নানান পরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। ফলে ১৯৮৩ সালে দুই পাহাড়ের মাঝখানে কাপ্তাই হ্রদের ওপর ৩৩৫ ফুট দৈর্ঘ্যের ঝুলন্ত সেতু তৈরি করে পর্যটন করপোরেশন। এরপর কার্যত আর কোনও উদ্যোগ নেয়নি বা পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি কোনও সংস্থা। সেই থেকে একটিমাত্র সেতুর ওপর ভিত্তি করেই চলছে রাঙামাটির পর্যটন ব্যবসা। কিন্তু প্রতিবছরই বর্ষার সময় তিন-চার মাস উজানের পানি নামলে সেতুটি তলিয়ে থাকে।
রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবিভিন্ন সময়ে রাঙামাটিতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অভিযোগ, রাঙামাটিতে ভালো মানের কোনও হোটেল-রেস্তোরাঁ নেই। কাপ্তাই হ্রদের মনোরম পরিবেশ ঘুরে দেখার জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন ইঞ্জিনচালিত বোট রয়েছে। তবে এখানে অত্যাধুনিক কোনও ওয়াটার বাইক না থাকায় ভ্রমণপিপাসুরা নিরুৎসাহিত হয়ে ফিরে যান। এছাড়া মতাদের দীর্ঘদিনের দাবি, পাহাড়গুলোতে ক্যাবল কারের ব্যবস্থা রাখা হোক।
রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপর্যটকদের চলাচলে জেলা শহরে বিশেষ কোনও যানবাহনের ব্যবস্থা নেই। সিএনজিচালিত অটোরিকশাই একমাত্র ভরসা। পর্যটকদের সঙ্গে এসব অটোরিকশাচালকের অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ শোনা যায় হরহামেশা। এ কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভ্রমণপ্রেমীরা বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান।
রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যস্থানীয় পর্যটন ব্যবসা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাঙামাটির পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয় সভা-সেমিনারে। এসব অনুষ্ঠানে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের আশ্বাস মেলে। পর্যটন খাতের উন্নয়নে শুধুই আশাবাদের গল্প শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো হ্রদ সৃষ্টির এত বছরেও এগোয়নি এই জেলার পর্যটন। কারণ জেলায় পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যরাঙামাটি হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যটনের উন্নয়নে জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অনেক কিছু করার থাকলেও তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। প্রতিবছর পর্যটন দিবসে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা পর্যন্তই যেন জেলা পরিষদ ও পর্যটন করপোরেশনের কাজ।’
রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপর্যটন শিল্পের বিকাশে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলো কখনও কারও পরামর্শ নেয়নি বলে মনে করেন এই হোটেল ব্যবসায়ী। তার অভিযোগ, ‘পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ড গঠন ও পার্বত্য জেলা পরিষদ শক্তিশালী করা হলেও তাদের কোনও ভ‚মিকা লক্ষ্য করা যায়নি। সংস্থাগুলো নামে বেনামে বিভিন্ন প্রকল্পে টাকা খরচ করে। কিন্তু মাত্র কয়েক কোটি টাকা খরচ করলে রাঙামাটির পর্যটন খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমরা উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যানের সঙ্গে কয়েকবার দেখা করেও আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই পাইনি।’
রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যতবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (প্রশাসন) আশীষ কুমার বড়ুয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যটন নিয়ে মূলত কাজ করে জেলা পরিষদ। কোথাও উন্নয়নের প্রয়োজন হলে আমাদের বললে তাতে অংশ নিই। যেমন, বান্দরবানে জেলা প্রশাসক উদ্যোগ নেওয়ায় পর্যটন স্পট মেঘলা গড়ে দিয়েছি। রাঙামাটিতেও কেউ যদি তেমন উদ্যোগ নেয়, অবশ্যই উন্নয়ন বোর্ড তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে।’
রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যরাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য ও পরিষদের হস্তান্তরিত খাত পর্যটন বিষয়ের আহ্বায়ক অমিত চাকমা রাজু বলেন, ‘১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী স্থানীয় পর্যটন শিল্প জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও সংস্থাটি এখনও তেমন কোনও উদ্যোগ নিতে পারেনি। পর্যটনে পার্শ্ববর্তী দুই জেলা থেকে রাঙামাটি অনেক পিছিয়ে আছে। তবে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প পাঠানো হয়েছে। সেটি পাস হয়ে আসার পর কাজ শুরু হলে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে।’
রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতুসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হ্রদ ও পাহাড়ের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে রাঙামাটিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।