মেঘ-পাহাড়ের রাজ্যে সুংসাংপাড়া, যেখানে পথের প্রতিটি বাঁকেই নতুন গল্প

পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকাবাঁকা পথ, চারপাশে সবুজের সমারোহ, দূরে মেঘের আনাগোনা আর পাহাড়ি মানুষের সাদামাটা জীবন। এটি বান্দরবানের সুংসাংপাড়ার চিত্র। এ যেন বান্দরবানের পরিচিত পর্যটন স্পটগুলোর বাইরে লুকিয়ে থাকা এক অন্যরকম জগৎ। কেওক্রাডংয়ের কাছাকাছি পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা এই বম জনগোষ্ঠীর পাড়ায় পৌঁছানোর পথ যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি সেখানে গিয়ে চারপাশের প্রকৃতি দেখার অভিজ্ঞতাও হতে পারে ভিন্নধর্মী।

বান্দরবানের রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নে অবস্থিত সুংসাংপাড়া। কেওক্রাডংয়ের গা ঘেঁষে থাকা এই পাহাড়ি জনপদে যেতে হলে সাধারণ ভ্রমণের চেয়ে একটু বেশি প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রচলিত রুটে বান্দরবান থেকে রুমা বাজার হয়ে মুনলাই পাড়া, বগালেক, দার্জিলিং পাড়া ও কেওক্রাডংয়ের দিক দিয়ে পাসিংপাড়া পেরিয়ে সুংসাংপাড়ায় পৌঁছাতে হয়। পথের কিছু অংশে পাহাড়ি যানবাহন এবং কিছু অংশে হাঁটতে হয়।

সুংসাংপাড়ার অন্যতম আকর্ষণ এর পথই। পাসিংপাড়া থেকে নামার সময় খাড়া পাহাড়ি পথ পেরোতে হয়। পথের দুই পাশে দেখা যায় পাহাড়ি মানুষের ঘরবাড়ি, সবুজ জুমের খেত আর পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতির নানা রূপ। কখনও মেঘ এসে ঢেকে দেয় চারপাশ, আবার কখনো মেঘ সরে গেলে চোখের সামনে খুলে যায় পাহাড়ের বিস্তৃত দৃশ্য।

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, সুংসাংপাড়ার আকর্ষণের বড় অংশ এখানকার জীবনযাত্রা। শহুরে কোলাহল থেকে অনেক দূরের এই জনপদে পাহাড়ি মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জুমচাষ, পাহাড়ি ঘরবাড়ি এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ভ্রমণটিকে নিছক দর্শনীয় স্থান দেখা থেকে আলাদা করে দেয়।

কেওক্রাডং ও আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের জন্য সুংসাংপাড়া তাই একটি বাড়তি আকর্ষণ হতে পারে। তবে এটি আরামপ্রিয় পর্যটনের জায়গা নয়। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ওঠানামা এবং আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকা জরুরি। স্থানীয় গাইডের সহায়তা নিয়ে যাত্রা করাই নিরাপদ ও সুবিধাজনক।

সাম্প্রতিক সময়ে সুংসাংপাড়াকে ঘিরে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। কেওক্রাডংয়ের পাদদেশে প্রায় ২ হাজার ১০০ ফুট উচ্চতায় সুংসাংপাড়ায় ‘আলা মি ত্লাং’ নামে একটি পর্যটনকেন্দ্র ও ইকো রিসোর্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় বম জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো।

তবে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্বশীল থাকাও জরুরি। পাহাড়ে প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলে না রাখা, স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি না করেই ভ্রমণ করা উচিত।

সুংসাংপাড়া মূলত তাদের জন্য, যারা শুধু কোনও পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে ছবি তুলে ফিরে আসতে চান না, বরং পাহাড়ের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতি, মানুষ ও পাহাড়ি জীবনের কাছাকাছি যেতে চান। মেঘে ঢাকা পাহাড়, জুমের সবুজ, নিরিবিলি জনপদ আর দুর্গম পথ এক সঙ্গে পেতে চাইলে সুংসাংপাড়া হতে পারে বান্দরবান ভ্রমণের এমন এক অধ্যায়, যার স্মৃতি অনেক দিন থেকে যায়।