সিলেট মানেই শুধু জাফলং কিংবা বিছানাকান্দি নয়। সীমান্তঘেঁষা এই জেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে এমন কিছু নীরব সৌন্দর্যের ঠিকানা, যেখানে প্রকৃতি এখনও অনেকটাই নিজের মতো। তেমনই এক অপরূপ স্থান গোয়াইনঘাটের লক্ষণছড়া।
পিয়াইন নদীর তীর ধরে এগিয়ে গেলে একসময় শহুরে কোলাহল পেছনে পড়ে যায়। সামনে দেখা মেলে সবুজে মোড়া গ্রাম, মেঠোপথ আর সীমান্তের নৈঃশব্দ্য। সেই পথ পেরিয়েই পৌঁছানো যায় লক্ষণছড়ায়। এখানে পাহাড়ি ঝিরির স্বচ্ছ জল, পাথর আর সবুজ প্রকৃতি মিলে তৈরি করেছে এক শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ।
লক্ষণছড়া সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। পান্থুমাইয়ের কাছাকাছি হওয়ায় দুটো জায়গা একসঙ্গে ঘুরে দেখার সুযোগও রয়েছে। লক্ষণছড়ার মূল আকর্ষণ এর পাহাড়ি ছড়া। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা সীমান্ত পেরিয়ে এ অঞ্চলের প্রকৃতিকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। শীতল স্বচ্ছ পানির ছড়া, পাথুরে তলদেশ আর চারপাশের সবুজ মিলে জায়গাটির সৌন্দর্য অনেকটাই আলাদা।
সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে দূরে দেখা যায় সবুজ পাহাড়ের ঢেউ। কোথাও ছড়ার ওপর ছোট সেতু, কোথাও পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানি। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক দৃশ্যই লক্ষণছড়ার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
মেঠোপথের ভ্রমণও যেন আলাদা গল্প লক্ষণছড়ায় যাওয়ার পথটিও কম আকর্ষণীয় নয়। পূর্ব রুস্তমপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে পিয়াইন নদীর পাড় ধরে এগোতে হয়। গ্রামের মেঠোপথ, চারপাশের সবুজ আর সীমান্তঘেঁষা শান্ত পরিবেশ পথটুকুকেও করে তোলে ভ্রমণের অন্যতম অংশ। অনেক পর্যটকের কাছে গন্তব্যের চেয়ে এই পথচলাই হয়ে ওঠে বেশি স্মরণীয়। কারণ এখানে গাড়ির জানালা দিয়ে শুধু দৃশ্য দেখা নয়, প্রকৃতির একেবারে কাছ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পান্থুমাইয়ের সঙ্গে একদিনে লক্ষণছড়া যারা পান্থুমাই ঘুরতে যান, তাদের ভ্রমণ তালিকায় লক্ষণছড়াও রাখা যেতে পারে। দুটি জায়গা কাছাকাছি হওয়ায় একই দিনে দুটির সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব। স্থানীয় ভ্রমণতথ্যসূত্রগুলোতেও পান্থুমাই ও লক্ষণছড়াকে পাশাপাশি গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সকালে পান্থুমাইয়ের ঝরনা দেখে এরপর লক্ষণছড়ার পথে যাত্রা এমন একটি ভ্রমণসূচি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য হতে পারে বেশ উপভোগ্য।
বর্ষায় বদলে যায় লক্ষণছড়ার রূপ। কারণ এ সময় পাহাড়ে বৃষ্টির পর ছড়ায় পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। তখন পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে চলা পানির ধারা আর সবুজ পাহাড়ের দৃশ্য লক্ষণছড়াকে দেয় অন্যরকম সৌন্দর্য। তবে বর্ষায় পাহাড়ি ছড়া ও নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। তাই পানিতে নামা বা পাথরের ওপর চলাচলের সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সীমান্তঘেঁষা সৌন্দর্য, মেনে চলতে হবে নিয়ম লক্ষণছড়া সীমান্তের খুব কাছাকাছি হওয়ায় ভ্রমণের সময় নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। সীমান্ত পিলার, সীমারেখা বা নিরাপত্তা বাহিনীর নির্ধারিত এলাকার দিকে না গিয়ে বাংলাদেশ অংশ থেকেই প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা উচিত।
ছড়া-পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করাও যাবে না। প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট কিংবা বোতল ফেলে রেখে আসা থেকে বিরত থাকাই প্রকৃতির প্রতি ভ্রমণকারীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
সিলেট শহর থেকে গোয়াইনঘাটের দিকে যাত্রা করে পান্থুমাই ও পূর্ব রুস্তমপুর এলাকার দিকে যেতে হয়। লক্ষণছড়ার শেষ অংশে স্থানীয় পথ ধরে হাঁটতে হতে পারে। বর্ষাকালে পানির অবস্থা ও স্থানীয় যাতায়াতের পরিস্থিতি আগে জেনে নেওয়া ভালো। প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার এক ঠিকানা লক্ষণছড়া হয়তো সিলেটের সবচেয়ে আলোচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি নয়। কিন্তু যারা ভিড়ের বাইরে গিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য জায়গাটি হতে পারে দারুণ এক আবিষ্কার।
পাহাড়ের নীরবতা, ছড়ার স্বচ্ছ জল, পিয়াইন নদীর স্রোত আর সীমান্তের সবুজ দৃশ্য মিলে লক্ষণছড়া যেন সিলেটের এক নীরব কবিতা। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে অনেক দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনও কখনও সীমান্তের এক ছোট্ট ছড়ার পাশেই লুকিয়ে থাকে ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর গল্প।

মেঘালয়ের পাদদেশে পানথুমাই, যার ঝরনার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবে মন







