প্রতিবেশী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে বাংলার ইতিহাসও নানাভাবে জড়িয়ে আছে। তাই কলকাতা ভ্রমণে গেলে শুধু শপিং, খাবার কিংবা শহরের পরিচিত দর্শনীয় স্থান নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত কয়েকটি জায়গাও ঘুরে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে ইতিহাস ও সাহিত্যপ্রেমী বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য এসব জায়গা হতে পারে অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
কলকাতা ও আশপাশে একদিন বা দুদিনের সফরে ঘুরে দেখা যায় এমন কয়েকটি ঠিকানা রইল—
নেতাজির বাড়ি, এলগিন রোড
কলকাতার এলগিন রোডের নেতাজি ভবন স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা। এখানেই ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর পারিবারিক বাড়ি। ব্রিটিশদের নজর এড়িয়ে ১৯৪১ সালে এই বাড়ি থেকেই তাঁর ঐতিহাসিক অন্তর্ধান ঘটেছিল।
বর্তমানে বাড়িটিতে রয়েছে জাদুঘর ও সংগ্রহশালা। নেতাজির ব্যবহার করা নানা সামগ্রী, চিঠিপত্র, ছবি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন দলিল দেখে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রামের নানা অধ্যায় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য জায়গাটি বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে, কারণ উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নেতাজির জীবন ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে।
অরবিন্দ ভবন
১৫ আগস্টের সঙ্গে অরবিন্দ ঘোষের সম্পর্কটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮৭২ সালের ১৫ আগস্ট জন্মেছিলেন তিনি—আর ১৯৪৭ সালের একই দিনে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত। কলকাতার শেক্সপিয়র সরণির অরবিন্দ ভবন তাই এই দিনে ঘুরে দেখার জন্য প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।
বাগানঘেরা এই বাড়িতে রয়েছে পাঠাগার, অরবিন্দের ব্যবহৃত ও লেখা নানা সামগ্রীর স্মৃতি এবং ধ্যানের পরিবেশ। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের পাশাপাশি দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলে জায়গাটি রাখতে পারেন ভ্রমণতালিকায়।
আলিপুর জেল মিউজিয়াম
স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে আরও কাছ থেকে অনুভব করতে চাইলে আলিপুর মিউজিয়াম হতে পারে সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ব্রিটিশ আমলের আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের ঐতিহাসিক অংশ এখন জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, জওহরলাল নেহরুসহ বহু রাজনৈতিক বন্দির সঙ্গে এই কারাগারের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।
কারাগারের পুরোনো পরিসর, বন্দিদের স্মৃতি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা ঘটনা সম্পর্কে জানা যায় এখানে। বর্তমানে জাদুঘরটি মঙ্গলবার থেকে রবিবার দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে; সোমবার বন্ধ। সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট দিনে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-ও হয়। সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে অফিসিয়াল তথ্য দেখে নেওয়া ভালো।
দেউলটিতে শরৎচন্দ্রের স্মৃতিবাড়ি
স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু রাজনীতি কিংবা বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়; সাহিত্যও মানুষের মনে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার চেতনা জাগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেই দিক থেকে হাওড়ার দেউলটির কাছে সামতাবেড়ের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি হতে পারে দারুণ একটি গন্তব্য।
কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় এই বাড়িতে কাটিয়েছেন। বাড়িটি এখন ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষিত। তাঁর লেখার টেবিল, ব্যবহৃত সামগ্রী এবং বাড়ির পুরোনো পরিবেশ দেখার পাশাপাশি কাছেই রূপনারায়ণ নদীর সৌন্দর্যও উপভোগ করা যায়। হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে দেউলটি পৌঁছে অটো বা টোটোয় সামতাবেড় যাওয়া যায়।
তমলুকে মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতি
একটু দূরে যেতে আপত্তি না থাকলে সফরে রাখা যায় পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদ মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতির সঙ্গে এই অঞ্চলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হোগলা গ্রামে তাঁর জন্মস্থান ও স্মৃতিচিহ্ন, আলিনানে স্মৃতিবিজড়িত স্থান এবং তমলুকের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা মিলিয়ে তৈরি হতে পারে একটি ইতিহাসনির্ভর দিনভ্রমণ।
তমলুক শহরে ঘোরার পাশাপাশি রূপনারায়ণ নদীর তীরেও কিছুটা সময় কাটানো যায়। ফলে ইতিহাসের সঙ্গে প্রকৃতির স্বাদও মিলবে এক সফরে।
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য ছোট্ট পরিকল্পনা
কলকাতা থেকে শুরু করলে প্রথম দিন শহরের নেতাজি ভবন, অরবিন্দ ভবন ও আলিপুর মিউজিয়াম রাখা সুবিধাজনক। দ্বিতীয় দিন সময় হাতে থাকলে দেউলটির শরৎচন্দ্রের বাড়ি ঘুরে আসা যায়। আর পুরো একটি দিন হাতে থাকলে তমলুকের জন্য আলাদা পরিকল্পনা করা ভালো।
ইতিহাসের বইয়ে পড়া নাম ও ঘটনাগুলোর সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করাই হতে পারে এই সফরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। কলকাতার চেনা ভ্রমণপথের বাইরে তাই এবার ইতিহাসের পাতায় হাঁটতে পারেন।