সাবেক যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী ও এইচ এম জাহিদ সিদ্দিক তারেকের অনুসারীদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে যুবলীগকর্মী রিজবী হাসান বাবু (৩৪) খুন হয়েছেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মতিঝিল থানার স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজনজন নেতাকর্মীর নামও বেরিয়ে আসছে। মৃত্যুর আগে বাবু হামলাকারীর কয়েকজনের নামও তার বাবা বলেছেন। যাদের গ্রেফতারে কাজ করছে পুলিশ।
শনিবার সকালে এজিবি কলোনির ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, কলোনির ১৭/বি-এর বাসার গেটের সামনে জমাট বাঁধা রক্ত জমে রয়েছে। গাছের দুটি ডাল ফেলে পুলিশ ক্রাইমসিন এলাকা সংরক্ষণ করে রেখেছে। বাসাটির নিচের তলার ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া। তারা কেউ বাসায় নেই। কলোনির কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন না।
ঘটনাস্থলে গিয়ে এক বৃদ্ধাকে পাওয়া যায়। তার নাম অভনী হলেও কলোনিতে তিনি নুরানী নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই কলোনির বাসা বাড়িতে কাজ করেন। ঘটনার সময় তিনি দুটি গ্যালনে করে পানি নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। তখন বাবুকে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে মোবাইলে কথা বলতে দেখছিলেন।
নুরানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাত পৌনে ১১ টার দিকে আমি দু’টি গ্যালনে পানি নিয়ে বাসায় যাচ্ছিলাম। তখন বাবু আর ইমনকে রাস্তায় দেখছি। তারা হেঁটে-হেঁটে মোবাইল ফোনে কথা বলতেছিল। আমি গেটের সামনে যেতে পারিনি। এরইমধ্যে ৫/৬ টা গুলির শব্দ পাই। এরপর আমি বাসার ভেতরে চলে যাই। ভয় পাইছি। সবাই দরজা জানালা আটকে দেয়। বাসার লাইট বন্ধ করে দেয়। এর আধাঘণ্টা পর পুলিশ আসে। আমি রাস্তায় বের হই। পুলিশ আমাকে বলে, এত রাতে আপনার এখানে কী কাজ। পরে আমি চলে যাই।’
নিহত বাবুর বাসা রাজধানীর সবুজবাগ থানার পূর্ব বাসাবোর ওয়াসা রোড এলাকায়। বাসা নম্বর ১০/৩/৩। এই বাসার দ্বিতীয় তলায় দুই মেয়ে দিপা (৫) ও দোহা (২) এবং স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। তার বাবার নাম আবুল কালাম হাসান। তিনিও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বাসাবোর বাসায় গিয়ে দেখা যায়, মতিঝিলের দশ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বাসার গ্যারেজের নিচে বসে আছেন। বাসার গেটের সামনেই বাবুর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স রাখা হয়েছে। আসরের নামাজের পর এজিবি কলোনিতে তার জানাজা শেষে আজিমপুরে দাফন করা হয়েছে।
২০১৩ সালের ২৯ জুলাই গুলশানে শপার্স ওয়ার্ল্ড নামে একটি বিপণী বিতানের সামনে খুন হন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কী। এরপর ওই বিপণী বিতানে থাকা ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওচিত্র দেখে হত্যাকারী হিসেবে যুবলীগ নেতা এইচ এম জাহিদ সিদ্দিক তারেককে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারেক গ্রেফতার হওয়ার পর খিলক্ষেতে র্যা বের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
বাবু নিহত হওয়ার পর মতিঝিলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা আবার ওই পুরনো দ্বন্দ্বের কথাই বলছেন। তারা অভিযোগ করছেন, যারা মিল্কী হত্যার সঙ্গে জড়িত, তারাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
দশ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি মারুফ রেজা সাগর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেও আমাদের অফিসটিতে হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনায় অফিসের কেয়ারটেকার ফুয়াদ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলাও দায়ের করেছেন। মামলায় তুষার, মিলন ও রানাকে আসামি করা হয়েছিল। তারা জামিনে রয়েছে। তারা সবাই অফিসে ভাঙচুর চালিয়েছিল। তাদের সেল্টার দেয় একটি গ্রুপ। আমরা কেন্দ্রে বহুবার বলেছি। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমরা বলেছি যেন আর কোনও লাশ না পড়ে। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনে না।’ তিনি বলেন, ‘যারা মিল্কী হত্যা মামলার চার্জশিট থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, তারাই এখন বিভিন্নভাবে আবার তৎপর হয়েছে। কখনও মাথা দেয়, কখনও শরীর দেয়। তাদের তৎপরতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই হত্যার সঙ্গেও তারা জড়িত।’
যুবলীগকর্মী পলাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ১৪ আগস্ট মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুর সঙ্গে ঝগড়া হয়। তার কর্মীরা আমাদের একটা ছেলেকে মারধর করেছিল। বাবু তা জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছিল। এ নিয়ে ঝগড়া হয়। তখন টিপু হুমকি দিয়ে বলেছিল, আরও মারলে কী হবে? এ নিয়েও বিরোধ ছিল।’ খুনিরা গুলি করে দ্রুত চলে যায়।’
মৃত্যুর আগে নিহত বাবু তার বাবার কাছে ছয়জনের নাম বলেছেন বলে জানিয়েছেন যুবলীগকর্মী পলাশ। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর আগে বাবু তার বাবাকে ছয়জনের নাম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ও স্কায়ার হাসপাতালে বসে বলেছেন।’
এজিবি কলোনির ওই ঘটনাস্থলে প্রবেশের জন্য তিনটি গেট রয়েছে। যুবলীগের ওই অফিসটির পেছনে একটি গেট আছে। এছাড়াও কলোনির স্কুল ও বাজারের পাশেও পৃথক দুটি গেট রয়েছে। নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও তারা কোনও কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, ‘ঘটনার সময় কয়েকজন যুবক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা ক্লাবের দিকে কাউকে যেতে দেয়নি।’
এদিকে আরেক গুলিবিদ্ধ যুবলীগ কর্মী আহসানুল হক ইমন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ইমনের ডান উরু ও পাঁজরে গুলির চিহ্ন এবং মাথায় কাটা জখমের চিহ্ন রয়েছে। অন্যদিকে বাবুর মুখের বাম দিকে গুলির চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল।
যুবলীগকর্মী রায়হান জানান, ‘বাবুর বাবার নাম কালাম হাসান। বাবু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন। দলীয় রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে এই ঘটনা ঘটতে পারে।’
নিহতের বাবা আবুল কালম হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার কাছে কয়েকজনের নাম বাবু বলছে। তবে সেগুলো আমি থানায়, আদালতে ও আল্লাহর দরবারে বলব। আর কাউকে বলব না।’ ছেলে কে কেন, হত্যা করল? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা করেছে, তারা আর আল্লাহ জানে। আমি কিছু জানি না।’
মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘লাশ আজিপুর গোরস্থানে দাফন করা হবে। এরপর আমি মামলা করব। ইতোমধ্যে পুলিশের একজন সহকারী কমিশনার (এসি) আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিহত বাবু ও আহত ইমনকে আমি চিনি না। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিও আমি আজ সকালে শুনছি। আমাদের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মারুফ রেজা সাগর এবং সাধারণ সম্পাদক মিলন।’
যদিও নিহত বাবুর বন্ধুরা দাবি করেছেন, ১০ নম্বর ওয়ার্ডে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পোস্টটি দেওয়া হয়নি। তবে রেজাউল করিম রেজা বলেন, ‘সাধারণ সম্পাদক দু’টি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক মিলন রয়েছেন।’
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ বা দলীয় কোন্দেলের বিষয়েও কিছু জানা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (ডিসি) আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনও কাউকে গ্রেফতরা করা যায়নি। নিহতের পরিবার জানিয়েছেন, তারা মামলা করবেন। আমরা অপেক্ষা করছি। হত্যার কারণসহ কারা জড়িত, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।’
/এমএনএইচ/আপ-এমও/