ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি: ২ বিদেশির পরিচয় নিশ্চিত

ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিরাজধানীর গুলশান, বনানী ও পল্লবী থেকে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে এটিএম বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত চার বিদেশির মধ্যে দু’জনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।বাকি দু’জনের বিস্তারিত পরিচয় এখনও জানা যায়নি। তাদের পরিচয় জানতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়ে তিন দফায় চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
তদন্তে চার দেশের যে চার বিদেশির নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন,থমাস পিওটর, এ্যান্ড্রি, রোমিও এবং তনি তদারভ।এদের মধ্যে এ্যান্ড্রি ইউক্রেনের ও রোমিও রোমানিয়ার নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।তবে তাদের সবার বিস্তারিত পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর এবিষয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করবেন তদন্ত কর্মকর্তা। এই ঘটনায় দায়ের করা তিনটি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এক ব্রিটিশ নাগরিকের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তার নাম ফরিদ নাবীর।তিনিই কার্ড জালিয়াতির মূলহোতা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে ঢাকার গুলশান, বনানী ও পল্লবীর বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া অভিযুক্ত চার বিদেশি হলেন, থমাস পিওটর, এ্যান্ড্রি, রোমিও এবং তনি  তদারভ। এদের মধ্যে এ্যান্ড্রি ইউক্রেনের, রোমিও রোমানিয়ার, তনি তদারভ বুলগেরিয়ার এবং থমাস পিওটর জার্মানির নাগরিক বলে নিজেদের দাবি করেছেন।তবে ডিএমপি ইন্টারপোলের সহায়তায় অভিযুক্তদের কাগজপত্র অনুযায়ী তাদের নিজ নিজ দেশে তিনদফায় চিঠি পাঠিয়ে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। এদের মধ্যে এ্যান্ড্রি ইউক্রেনের ও রোমিও  রোমানিয়ার নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পিটার থমাসের নাগরিকত্বের বিষয়ে জার্মানি এবং তনি তদারভের বিষয়েও বুলগেরিয়া এখনও কিছু জানায়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে আমরা ইতোমধ্যে চার বিদেশির নাম পেয়েছি। তবে তাদের দেশ ওইসব নাগরিকের নাগরিকত্ব স্বীকার করে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযোগত্র দেওয়া হবে। কারণ,দেশ ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হয়ে অভিযোগপত্র দিলে তাদের গ্রেফতারে  ইন্টারপোলের সহযোগিতা পেতে ঝামেলা হতে পারে। আমরা চাই অভিযুক্তদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব সম্পর্কে তাদের দেশ স্বীকার করলে,পরে গ্রেফতারের জন্য ইন্টারপোলের রেড এলার্ড জারি করা হবে।

এই তদন্ত কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পিটার থমাস আগেই বাংলাদেশে  আসেন। চার বিদেশি আন্তর্জাতিক হ্যাকার। তারা মূলত বিদেশি কার্ড হ্যাক করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার টার্গেট নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। তারা বাংলাদেশকে নিরাপদ মনে করেছেন।পিটারের ইচ্ছা ছিল না বাংলাদেশি কোনও ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি করার।তবে অপর তিনজন বাংলাদেশিদের কার্ডও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত করেন। এরপর গ্রাহকদের মোবাইলে  টাকা উত্তোলনের নোটিফিকেশন মেসেজ যাওয়াতে তারা ধরা পড়েন। এনিয়ে অপর তিনজনের সঙ্গে পিটারের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

সূত্রটি জানায়, বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এক ব্রিটিশ নাগরিক বাংলাদেশে কার্ড জালিয়াতির মূলহোতা। তার নাম ফরিদ নবীর। তিনি যুক্তরাজ্যে থাকেন। সিলেটের মৌলভীবাজারে তার বাড়ি। নবীর যুক্তরাজ্যের কোনও এলাকায় থাকেন তাও জানা যায়নি। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা। ইউরোপেই এদের সবার পরিচয় হয়েছিল। এরপর ছক করেই তারা বাংলাদেশে আসেন।

গত ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি ইসিবি, সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকের বিভিন্ন বুথ থেকে ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় জালিয়াতি চক্রটি। এরপর ব্যাংকগুলো এই ঘটনায় মামলা দায়ের করে। মামলাগুলো ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। জালিয়াতি চক্রকে গ্রেফতার করতে মাঠে নামে ডিবি। ব্যাংক থেকে সরবরাহ করা ভিডিও ফুটেজ ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই অপরাধী চক্রকে গ্রেফতার করেন গোয়েন্দারা। মামলাটি বর্তমানে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট তদন্ত করছে। তবে মামলায় সব আসামি ছিল অজ্ঞাত ।অভিযুক্ত থমাস পিওটর গত ১০ মার্চ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

ঘটনার পর থমাস পিওটর বাংলাদেশে থাকলেও ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি অপর অভিযুক্ত বিদেশিরা পালিয়ে যান।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধের এক কর্মকর্তা বলেন, বুলগেরিয়ার নাগরিক হিসাবে যাকে আমরা চিহ্নিত করেছি, তার বিষয়ে তথ্য চেয়ে  এসবির কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনও তার বিষয়ে কোনও তথ্য তারা দেয়নি।

তিনি বলেন, থমাস পিওটরের নাগরিকত্ব এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি পোল্যান্ডের পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু যদিও তার পাসপোর্টের মেয়াদ ছিল না। এছাড়া তার কাছে জার্মানির জাতীয় পরিচয় পত্র পাওয়া গেছে, সেটিও ছিল মেয়াদ উত্তীর্ণ।  জার্মানিতে তার বিষয়ে তথ্য চাওয়া হলেও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। তিনি নিজেকে জার্মান নাগরিক বলে নিজেকে দাবি করেছেন। তার মা পোল্যান্ডের নাগরিক।বাবা রাশিয়ান।এই সূত্রে তার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এই কর্মকর্তা আরও বলেন, থমাসের ব্যাপারে আরও নিশ্চিত হয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। সর্বশেষ তার ফিঙ্গার প্রিন্ট জার্মানিতে পাঠানো হয়েছে।জার্মানি না করলে পোল্যান্ড ও রাশিয়াতেও পাঠানো হবে।এরপর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সিটি ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা মোরশেদ আলম মাকসুদ, রেজাউল করিম ও রিয়াজ আহমেদ গ্রেফতার হলেও তারা জামিনে মুক্ত হয়েছেন। থমাস যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তাতেও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে ভুক্তোভোগী গ্রাহকদের সব টাকা ফেরত দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

এবিষয়ে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ টিমের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আলিমুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা চার বিদেশির যে নাম ঠিকানা পেয়েছি তা যাচাই-বাছাইয়ের পর এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে তাদের বিষয়ে এখনও তদন্ত চলছে বলেও তিনি জানান।

/এআরআর/এপিএইচ/আপ-এনএস/