পাশেই লেক, ৩২ গেট: তারপরও ডিসিসি মার্কেটের আগুন নেভেনি ২২ ঘণ্টাতেও!

ধসে পড়েছে ডিসিসি মার্কেটগুলশান এক নম্বরের ডিসিসি মার্কেটে আগুন লেগেছে সোমবার দিবাগত রাত ২টায়। ঘটনাটি জানার পরপরই সেখানে আগুন নেভানোর কাজে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট। কিন্তু, এ আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনও পুরোপুরি নেভেনি। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ঘটনার ২২ ঘণ্টা পরও আগুন পুরোপুরি নেভাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই মার্কেটে প্রবেশের জন্য ৩২টি গেট এবং আশেপাশে তিনটি লেক থাকা সত্ত্বেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আগুন নেভাতে না পারার ঘটনা রহস্যজনক। ফায়ার সার্ভিসের এ ব্যর্থতার কারণেই তারা সর্বস্ব হারিয়ে পথের ভিখারি হয়ে গেছেন।
সোমবার গভীর রাতে লাগা এ আগুনের খবর বেশিরভাগ ব্যবসায়ী জানতে পারেন মঙ্গলবার সকালবেলা। তবে যখনই যিনি জানতে পেরেছেন সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে এসে নিজেদের দোকানের মালপত্র সরানোর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু তার আগেই অনেকের দোকানের সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা ও উদ্ধার তৎপরতার কারণে অনেকে নিজের দোকান পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারেননি।
মঙ্গলবার সকালবেলা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের আহাজারি ও আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে আশপাশের এলাকা। অনেকে নিজেদের মালামাল সরানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, আগুন নেভানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। কিন্তু, তাদের চেষ্টায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। একইসঙ্গে তাদের অভিযোগ, মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সরাতে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এ আগুন লাগিয়েছে।
ধোঁয়াচ্ছন্ন ডিসিসি মার্কেটডিসিসি মার্কেটের ২৯ নম্বর দোকান রিয়া এন্টারপ্রাইজ। এই দোকানের মালিক রুনা আহমেদ কাঁদতে কাঁদতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই দোকানের বিপরীতে আমার ৪০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আগুন লেগে আমাদের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এখন আমরা কী করব?’
রুনা আহমেদ আরও বলেন, ‘গত রাতেও দোকানে মালামাল সেল (বিক্রি) করেছি। দোকান বন্ধ করে বাসায় যাওয়ার পর রাতে শুনি আগুন লেগেছে। রাত তিনটা থেকে দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতরে ঢুকতে পারি নাই। চোখের সামনে সব পুড়ে গেছে।’
গুলশান কাঁচা মার্কেটের হাসান এন্টার প্রাইজ দোকানের মালিক মো. শামসুর আলম বলেন, ‘আমি ৩২ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। সারাজীবনের পুঁজি শেষ হয়ে গেল। রাত ৪টার সময় এসে দেখি ধসে পড়া ভবনটিতে আগুন জ্বলছে। কিভাবে কী হলো, কিছুই বুঝতেছি না। আমার দোকানে প্রায় ৭০/৮০ লাখ টাকার মাল ছিল। পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করতাম। দোকানের ক্যাশেও এক লাখ ২২ হাজার টাকা ছিল।’
শামসুর আলম বলেন, ‘আমি বিভিন্ন পার্টির কাছ থেকে বাকিতে মাল নিয়ে আসি। পার্টি টাকা পাবে। কোনও কিছুই বাঁচাতে পারলাম না।' এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘কাল (সোমবার) রাত ৯টায় দোকান বন্ধ করে যাই। পরে কিভাবে আগুন লাগছে তা বুঝতেছি না।’
ডিসিসি মার্কেটের কাঁচা ও পাকা মার্কেটে ৬ শতাধিক দোকান ছিল। এর মধ্যে আগুন লাগার ১৫ মিনিটের মধ্যে কাঁচা মার্কেটটি ধসে পড়ে। আর পাকা মার্কেটে আগুন একপাশে লাগলেও পরে ধীরে ধরে তা ছড়িয়ে যায় প্রায় সবদিকে। আগুনে প্রায় আড়াইশ’ দোকান পুরোপুরি পুড়ে গেছে এবং বাকিগুলো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানান ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।
আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, এই মার্কেটটি ছিল এই এলাকার মধ্যবিত্তদের মার্কেট। কিন্তু এটি বহুতল করার জন্য পাঁয়তারা করছিল সিটি করপোরেশন। তারা মেট্রো গ্রুপের কাছে মার্কেটটি বহুতল করার জন্য চুক্তি করেছে। কিন্তু, ব্যবসায়ীদের এতে আপত্তি থাকায় তারাই পরিকল্পিতভাবে এ নাশকতার ঘটনা ঘটিয়েছে।
তবে এসব কথা মানতে রাজি নন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক। তিনি মঙ্গলবার সকালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিদর্শন করতে এসেই এ আগুন উদ্দেশ্যমূলকভাবে লাগানো হয়নি বলে দাবি করেন। ব্যবসায়ীদের দাবির বিপরীতে গিয়ে সাত সকালেই মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘মনে হয় এটা ইলেকট্রিসিটির আগুন। এখানে প্রচুর ফ্লেমেবল (দাহ্য) প্রডাক্ট আছে। তাই মনে হয় এখানে নাশকতা না ঘটানোর সম্ভাবনা ৯৯ পারসেন্ট।’ তবে পরে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান তিনি। এত বড় আগুন লাগার ঘটনায় কোনও প্রাণহানি না ঘটাকে তিনি আল্লাহর রহমত বলেন।
এদিকে এ আগুন লাগার ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস।
আগুন লাগার পরে কাছে পিঠে তিনটি লেক থাকা সত্ত্বেও এবং কাঁচা ও পাকা মার্কেট মিলে ৩২টি প্রবেশপথ থাকা সত্ত্বেও ফায়ার সার্ভিস কেন দ্রুত আগুন নেভাতে পারলো না সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ছড়াচ্ছে মুখে মুখে। কিন্তু অভিযোগটি আমলে না নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, পানির উৎস নিকটবর্তী না হওয়ায় আগুন নেভাতে সমস্যা হয়েছে।
ডিসিসি মার্কেটের সামনের অংশ
এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার খবর দিয়ে বলেন, ‘আমরা কনফিডেন্ট, আগুন আমাদের আওতায় রয়েছে। আল্লাহ চাইলে আর বাড়তে পারবে না। ভেতরে ছোট ছোট আগুন রয়েছে, যাকে আমরা স্পট ফায়ার বলি। সেগুলো না ছড়ানোর জন্য ডিএনসিসির মেয়র মহাদয়ের কাছে সরঞ্জাম চেয়েছি, তিনি আশ্বস্ত করেছেন। সরঞ্জাম পেলে আমরা কাজ শুরু করবো। তবে আগুন আর বাড়তে পারবে না।’

পরে মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতেও মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, মার্কেটের কিছু কিছু স্থানে এখনও স্পট ফায়ার রয়েছে। তিনি বলেন, ‘তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সারারাত ঘটনাস্থলে থাকবেন। তারা দেখবেন, কোনও ধরনের দুর্ঘটনা যেন না ঘটে।’
এদিকে এই আগুন লাগার ঘটনাকে ষড়যন্ত্র ও নাশকতামূলক বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করার পেছনে শক্ত যুক্তি হচ্ছে মেট্রো গ্রুপের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের চুক্তি। ঢাকা সিটি করপোরেশন অভিন্ন থাকাকালে তদানীন্তন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা এই মার্কেটটি বহুতল করার জন্য মেট্রো গ্রুপের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু, ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে কাজ শুরু করতে পারেনি তারা। বরং বিষয়টির সমাধান চেয়ে আদালতে রিট করেছিলেন ব্যবসায়ীরা।
দীর্ঘদিন এ অবস্থায় বিষয়টি ঝুলে থাকার পরে সম্প্রতি সমস্যাটি নিরসনে উদ্যোগ নেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মেয়র আনিসুল হক। এ বিষয়টি স্বীকার করে মহানগর গুলশান জোন দোকান মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই মাস আগে মেয়র আনিসুল হকের সঙ্গে দোকান মালিকদের নেতা ও মেট্রো গ্রুপের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। স্থানীয় একটি মসজিদে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মার্কেটের কাঁচা অংশের নেতারা আপত্তি জানালেও পাকা মার্কেটের নেতারা মার্কেট উন্নয়নের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। তখন থেকেই এ মার্কেটটি ভেঙে ফেলা নিয়ে আলোচনা ছিল।’
এ কারণে হুট করে আগুন লাগার ঘটনাটি নিয়ে ব্যবসায়ীরা সন্দেহ প্রকাশ করেছে। কারণ, কোন দোকান থেকে বৈদ্যুতিক শট সার্কিট হয়ে আগুন লেগেছে এখন পর্যন্ত তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পাশাপাশি অন্য অনেক ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আগুন নিভিয়ে ফেললেও রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ডিসিসি মার্কেটের আগুন নেভাতে তাদের তৎপরতা বেশ ঢিলেঢালা ছিল বলেই বেশিরভাগ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন।
ধসে পড়া ডিসিসি মার্কেটের একাংশনুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগুন লাগার পরে পরিকল্পিতভাবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করেনি। তারা প্রথমে দুইটি গাড়ি নিয়ে আসে। একটা গাড়ি থেকে পানি দেওয়া হয়েছিল। সে পানি ভেতরে প্রবেশ করেনি। সকালে তারা গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি করে। রাতেই যদি তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী পানি দিত, তাহলে আগুন ছড়াত না। প্রথমে কাঁচা মার্কেটে আগুন লেগেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না করায় পাকা মার্কেটেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাতে ফায়ার সার্ভিসের সার্চলাইট ছিল না। মার্কেটে কোনও আলোও ছিল না। এসব কারণে রাতে ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে পারেনি।’
ডিসিসি মার্কেটের রয়্যাল ফার্নিচার দোকানের মালিক গোলাম খাজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাঁচাবাজারের পূর্ব ও দক্ষিণ কর্নারে আগুন লাগে। ভোররাত ৪টার দিকে কাঁচাবাজারের এক অংশ ধ্বসে পড়ে। সকাল ৮টার দিকে পুরো ভবনটিই ধ্বসে পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘ভোররাতে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণের তৎপরতা দেখায়নি। আমাদের দুই মার্কেটে ৩২টি গেট আছে। বাইরে থেকে দোতলায় সরাসরি প্রবেশের জন্য ৪টি সিঁড়ি আছে। মার্কেটের ভেতরে প্রতিটি দোকানের সামনে ১৫ ফুট করে স্পেস রয়েছে। এসব জায়গায় আমরা কিছু রাখি না। এই জায়গা দিয়ে সহজেই পানির পাইপ নিয়ে প্রবেশ করা যেত। কিন্তু ভোর রাতে মোটা পাইপ দিয়ে পানি দিয়েছে। সেটা নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।’
গোলাম খাজা প্রশ্ন করে বলেন, ‘মাঠ, সড়ক ও সিঁড়িতে এত খালি জায়গা থাকা সত্ত্বেও দোতলা একটি মার্কেটের আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। তাহলে বহুতল মার্কেটে তারা কী করবে?’
তবে আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতার অভাবের অভিযোগ অস্বীকার করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, ‘মার্কেটে আগুন নিয়ন্ত্রণে কোনও ব্যবস্থা নেই। সাতশ মিটার দূর থেকে ঝিল, লেক থেকে পানি আনতে হচ্ছে। সেখানে টাইম কিলিং (সময় নষ্ট) হচ্ছে।’
শাকিল নেওয়াজ আরও বলেন, ‘আমাদের ছেলেরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। ফায়ার সার্ভিস মানুষের জীবন বাঁচায়।’
অন্যদিকে, ১৫/১৬ ঘণ্টা পরও আগুন পুরোপুরি না নেভার বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি মার্কেট ধসে পড়েছে, সেখানে ঠিকভাবে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। অপর মার্কেটে প্রচুর প্লাস্টিক, ফেব্রিকস ও কসমেটিক্স পণ্য রয়েছে। প্রচুর দাহ্য পদার্থ রয়েছে। তাই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।’

 

/আরজে/টিএন/আপ-টিআর/