সন্তানরা কোনও নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত থাকলেও তাদের বিচারও দাবি করেছেন এই বাবা। যদিও যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে তাদের নাম আসছিল, ওই বাহিনীর কর্মকর্তারা এখনও এই দুই জনকে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাননি। তারা দু’জনই কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) হেফাজতে রয়েছে। জঙ্গি প্রতিরোধে গঠিত পুলিশের এই বাহিনী তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
গত ২০ মার্চ রাজধানীর বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ী থেকে নব্য জেএমবির পাঁচ সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেফতার করে র্যাব ১০। তারা হলো, অলিউজ্জামান অলি (২৮), আনোয়ারুল আলম (২৯), সালেহ আহাম্মেদ শীষ (২২), আবুল কাশেম (২৭) ও মোহন মহসিন (২০)। র্যাবের দাবি তারা সবাই নব্য জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সদস্য। এই গ্রুপে ১০/১২ জন সদস্য রয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা কাফরুল এলাকায় একটি জঙ্গি সেলের সদস্য।
পরদিন ২১ মার্চ কারওয়ানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপিরচালক (অপারেশন) কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘এই জঙ্গি সেলটি মিরপুরের একটি সরকারি স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল। এই নাশকতা পরিচালনার জন্য মনির এবং সালমান ওরফে আব্দুল্লাহকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু র্যাবের বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই সেলের পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হলো। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’ তিনি জানান, ‘তারা সবাই কাফরুল এলাকায় একটি জঙ্গি সেলের হয়ে কাজ করে। প্রায় ১৫ মাস যাবত তারা সবাই একত্রিত হয়েছে। তাদের সদস্য সংখ্যা ১০/১২ জন। তাদের অধিকাংশই কাফরুল ও মিরপুর এলাকার বাসিন্দা। এর সঙ্গে দ্বীন ইসলাম ওরফে দিনু (২৫) ও সালমান সাজীদ (২২) নামে দুই তরুণ জড়িত। তাদের খোঁজা হচ্ছে।’
র্যাবের ব্রিফিংয়ে ওই দুই তরুণের নাম প্রকাশ করার পর গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়। এরপর ২৩ মার্চ রাতে পূর্ব কাজীপাড়ায় ওই দুই ভাইয়ের বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। তবে তাদের সঙ্গের লোকজনকে র্যাব আগেই গ্রেফতার করায় তারা দুই ভাইকে বাসা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে রেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন আলমগীর হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার দুই ছেলে মিরপুরের একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। বড় ছেলে দ্বীন ইসলাম ওরফে দিনু মাদরাসায় লেখাপড়া শেষ করেছে। ছোট ছেলেকে মাদ্রাসায় দিলেও সে লেখাপড়ায় মনযোগী ছিল না। তাই তাকে ব্যবসায় বসিয়ে দেই আমার সঙ্গে। তারা দু’জনই আমার ব্যবসা দেখাশোনা করে। আমি তাবলিগ করি। আমি কখনও ছেলেদের হাতছাড়া করিনি। তারা কোথাও গিয়ে কখনও থাকেনি। যাদের র্যাব গ্রেফতার করেছে, তাদের মধ্যে আবুল কাশেম ও অলিউজ্জামান অলির সঙ্গে আমার ছেলেদের ওঠাবসা ছিল। তারা এক সঙ্গে নামাজ পড়তো। তাই আমরা ধারণা করছি, আমার দুই ছেলেকেও গ্রেফতার করতে পারে। তাই তাদের সরিয়ে রেখেছিলাম। এরপর পত্রিকায় যখন তাদের নাম এলো, তখন এলাকার মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেই, তাদের পুলিশে দেওয়ার।’
বাংলা ট্রিবিউনকে এই বাবা আরও বলেন, ‘র্যাব আমার ছেলেদের নাম বলার পর আমি তাদের সঙ্গে বসেছি। আমি ছেলেদের জিজ্ঞাসা করেছি, তোমরা এমন কিছুর সঙ্গে জড়িত কিনা, তাহলে সত্য বলো। আমরা ছেলেরা বলেছে, কোনও জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে থাকলে আমরা আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে বাসায় আসতাম না। তাহলে আগেই পালিয়ে যেতাম।’
তাদের পুলিশে দেওয়ার পর থেকেই পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
সিটিটিসি’র এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, এখনও তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের বিষয় তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’
এদিকে পুলিশে সোপার্দ করার ১১ দিন পরও র্যাব তাদের এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। সিটিটিসি’র উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা র্যাবের দায়ের করা একটি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি। র্যাব তদন্তের স্বার্থে যেকোনও সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে।’
ওই দুই তরুণের বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘র্যাব বাসায় এসে অনেক খোঁজাখুজি করেছে, তবে বাসায় কিছু পায়নি। আমি বিষয়টির একটি ভালো ফয়সালা চেয়েছি। কারণ আমার পরিবারে কোনও দাগ নেই। তাই পুলিশে দিয়ে আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিয়েছি। দুই ছেলেই মিরপুর ১৩ নম্বর দারুলউলুম মাদ্রাসায় পড়েছে। আমার চোখে কখনও তাদের কিছু চোখে পড়েনি। আমি জঙ্গিদের এই মানুষ হত্যার মতো জগন্য কাজ ঘৃণা করি। বাবা হিসেবে আমি কখনও চাইব না, আমার ছেলেরা জঙ্গি হোক। এটা কোনও বাবা চাইবেন না। জঙ্গিদের এই পথ আমি সমর্থন করি না, এটা কোনও আল্লাহর পথ না, এটা জাহেলিয়ার পথ। এটা হলো শয়তানের পথ।’
এদিকে এ বিষয়ে র্যাব ১০-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, ‘গ্রেফতারকৃত অন্য পাঁচজনের জিজ্ঞাসাবাদেই দিনু ও সাজীদের নাম এসেছে। তারা এজাহারভুক্ত আসামি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
/এমএনএইচ/