নিহত শিরিনের স্বজনরা জানান, যৌতুকের কারণে নির্যাতন ও তিন বছরের শিশু সন্তানকে নিয়ে যাওয়া নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শিরিন ও তার স্বামী ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল। এসব কারণে গত ৯ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানায় একটি জিডি (নং-৭০৫) করেছিলেন শিরিন। জিড়ির তদন্ত করছিলেন থানার এসআই শিমুল। এই জিডির পর ইব্রাহিম ও তার পরিবারের লোকজন ক্ষুব্দ হয়ে ওঠে শিরিনের ওপর। এরপর থেকেই শিশু সন্তান দোয়াতকে নিজেদের কাছে রেখে তা গোপন করে। তিন দিন আগে দোয়াত তাদের কাছে আছে জানিয়ে শিরিনের কাছে খবর পাঠায় ইব্রাহিম। মন চাইলে তাকে নিয়ে আসতে পারে। এমন খবরে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি যান শিরিন। কিন্তু পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী শিরিনকে কুপিয়ে তারা পালিয়ে যায়।
এর আগে শিরিনের মামাতো বোনের বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়ে রাজধানীর মীরহাজিরবাগের পার গেন্ডারিয়া এলাকায় ইব্রাহিমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর মোবাইলফোনে যোগাযোগের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্কে গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে। প্রথমে তারা পালিয়ে বিয়ে করলেও ২০১০ সালে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে মেনে নেওয়া হয়। বিয়ের পর তাদের কোলজুড়ে আসে শিশুসন্তান দোয়াত। এরপরই ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে ইব্রাহিম বেপারী ওরফে ইব্রাহিম হোসেন পাখি। নানা কায়দায় যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন শুরু করে শিরিনকে। টাকা না পেলে কখনও কখনও শিশু দোয়াতকে নিজের কাছে রেখে স্ত্রীকে জোর করে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতো ইব্রাহিম।
শিরিনের চাচা আনিস হাওলাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি নিজেই সাত-আট মাস আগে ওই সন্তানকে আনার জন্য গিয়েছিলাম। শিশুটিকে এনে তার মায়ের কাছে দিয়েছিলাম। কিছুদিন পর ইব্রাহিম শিশুটিকে নিয়ে যায়। ইব্রাহিমের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার ব্যাজগাঁও গ্রামে। তার বাবার নাম হাসেম আলী ব্যাপারী। বিয়ের আগে ইব্রাহিম মোবাইল মোরামত ও কাপড় ইস্ত্রি করলেও বিয়ের পর ভ্যান চালাতো।
শিরিন আক্তারের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা ঢাকার মীর হাজীরবাগে ভাড়া থাকেন। শিরিনের বাবার নাম সিরাজ হাওলাদার।
সুরতহাল রিপোর্টে যা আছে
আজ দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিরিনের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। শাহবাগ থানা পুলিশের এসআই বদরুল হাসান লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, মাথার পেছনে ডানপাশে কালো ফুলা জখম পাওয়া গেছে। উভয় চোখ বন্ধ কালো ফুলা জখম, নাকে কালো জখম। রক্ত বেরিয়েছে নাক ও মুখ দিয়ে। ডান কাঁধের বিভিন্ন স্থানে কালো ফুলা জখম। বাম হাতের কনুইয়ের ওপর দেড় ইঞ্চি কাটা জখম। বুকের নিচ হইতে নাভির নিচ পর্যন্ত গভীর কাটা রক্তাক্ত জখম, যা লম্বায় অনুমান ১২ ইঞ্চি। পেটের বাম পাশে চারটি সেলাই, পেটের বামপাশের তলপেটে একটি সেলাই ও পিঠের বামপাশে আটটি সেলাই। পেটের ডানপাশে গভীর ক্ষত জখম, যে কারণে ভুড়ি ও রক্ত বেরিয়েছে। গায়ের রং কালো। পরনের বিভিন্ন রংয়ের ছাপার সেলোয়ার ও কামিজ যা আলামত হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এস আই বদরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিরিনকে হত্যার উদ্দেশ্যেই ধারাল অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধান, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের আলামত স্পষ্ট। এখন মামলা হওয়ার পর আসামিদের গ্রেফতারের পরই শিরিন হত্যার কারণ জানা যাবে।’
/জেইউ/এমএনএইচ/