ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বলেন, ‘আমাদের ডাকা হয় সহযোগিতার জন্য, আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশের হাতে। আমাদের কাছে কোনও অস্ত্র নেই। আমরা নিরস্ত্র বাহিনী। আমাদের ফুল সিকিউরিটির দায়িত্ব নিরাপত্তাবাহিনীর। এখন আমাদের রেখে যদি কেউ চলে যায়, তাহলে আমাদের কিছু বলার থাকে না। এসব স্পেশাল অপারেশন সবসময় পরিকল্পনা নিয়ে করতে হবে। যেন কম ক্যাজুয়ালিটি হয়, মানুষ যেন কম মারা যায়। এখানে প্রথমে ওয়ার্নিং দিতে হবে। আমাদের পেশাদারিত্বের সঙ্গে আগাতে হবে। আমি বলব, এখানে পেশাদারিত্বে অভাব ছিল।’ তিনি বলেন, ‘এই অভিযানে পরিকল্পনা ও পেশাদারিত্বে অভাব ছিল। যখন জঙ্গিরা আস্তানা থেকে আসতেছিল, তাদের হাতে ওইরকম কোনও অস্ত্রও ছিল না। নিয়ম হচ্ছে, একজন যখন অভিযানে কাজ করলে অন্যরা তাকে নিরাপত্তা দেবেন। কিন্তু এমন প্রস্তুতি ওখানে ছিল না। সেনাবাহিনী, র্যাব ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) যখন কাজ করে, তারা কিন্তু পেশাদারিত্ব নিয়েই কাজ করে। ওখানে সেটা ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আলাদাভাবে তদন্ত করছি। ওখানে যে কর্মকর্তারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব। ওখানে আমাদের কোনও সিনিয়র অফিসার ছিল না। তারাই (পুলিশ) ছিল। তাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। এখানে বড় একটা গ্যাপ ছিল। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি জানতে চাইব।’
নিহত ফায়ার সার্ভিসকর্মীর পরিবারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হবে উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি বলেন, ‘এই ঘটনায় খুব ব্যথিত। আমরা পুলিশের কোনও কাজই করব না। পুলিশ বলছে, তারা ফায়ার করছে গুলি লাগেনি। এটা কোনও কথা হলো?’
ফায়ার সার্ভিসের ডিজির সঙ্গে একমত প্রকাশ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে যাদের অভিযান পরিচালনা করার কথা, তারা না করে স্থানীয় পুলিশ কেন করলো? স্থানীয় পুলিশ কি এই অভিযান পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত? সিটিটিসি, র্যাব তাহলে কী করবে? এর দায় স্থানীয় পুলিশকে নিতে হবে।’
এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অপারেশন) নেসারুল আরিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ঘটনার সময় স্পটে ছিলাম না। ঘটনার পর আমি ভিডিও ক্লিপস দেখেছি। পরবর্তী সময়ে শুনেছি, দেড় থেকে দুইশ গজ দূর থেকে জঙ্গি আস্তানায় পানি মারা হচ্ছিল। এখানে যে বিষয়টি ঘটেছে, এর আগে কখনও এমন হয়নি। সেই জিনিসটাই এখানে হয়েছে। তা হলো, জঙ্গিরা কখনও আস্তানা থেকে বের হয়ে আসে না। তারা আস্তানার ভেতরেই সুইসাইডাল ভেস্ট বিস্ফোরণ ঘটায়। যখন তারা বের হয়ে আসছিল, আমি ভিডিওতে দেখেছি। আমাদের রি-অ্যাকশন টাইমটা পাওয়া যায়নি। কারণ যখন পানি দেওয়া হচ্ছিল তখন ফগ (কুয়াশা) হয়। সেই ফগের ভেতর থেকেই জঙ্গিরা এসে আক্রমণ করে। সেখানে আরও চার পাঁচজন ফায়ার সার্ভিসকর্মী ছিলেন। তারা দৌড়ে সেভ হতে পারলেও মতিন পারেননি। তিনি পা পিছলে পড়ে যান। ৫/৬ মিনিটের ভেতরে জঙ্গিরা তার পিঠের ওপর ভেস্ট বিস্ফোরণ ঘটনায়। তাকে কাস্তে ও লোহার ছুরি দিয়ে কোপাতে থাকে। এটা অপারেশনে অপারেশনাল অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আমাদের পুলিশ তিন দিকেই ছিল। যেখান থেকে পানি দিচ্ছিল সেখানেও পুলিশ ছিল। আমার মনে হয়, তার কপাল খারাপ।’
জঙ্গিরা যখন ধাওয়া করেছে, তখন পুলিশ গুলি করলো না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তখন গুলি করলে, আমাদের ফায়ারম্যানের গায়েই লাগতো। ওখানে রি-অ্যাকশন টাইম পাওয়া যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘থানা নির্বাহী কর্মকর্তা ভিডিও করেছেন। ৯ মিনিটের ওই ভিডিও আমি দেখেছি। এটি দেখে মোটামুটি আমি কনভিন্স, এখানে আমাদের কোনও গাফিলতি ছিল না। এই ঘটনা আগে ঘটেনি, তাই আমাদের মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। সব জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় গরম পানি দেওয়া হয়। আমাদের এখানেও পুকুর থেকে পানি দেওয়া হয়েছে। আমাদের কোনও গাফিলতি ছিল না। আমাদের তিনদিকেই পুলিশ ছিল। প্রথম যে হামলাকারী জঙ্গি ছিল, তাকে লক্ষ করে গুলি করা হয়েছে। পেছনে যারা ছিল, তাদের লক্ষ করে গুলি করা হয়েছে। যে মেয়েটা বেঁচে আছে, ওই দিকেও গুলি হয়েছে। তবে বাচ্চারা ফেরেশতার মতো তাই অলৌকিকভাবে তারা বেঁচে গেছে। আর আমাদের কিন্তু সবদিক থেকেই গুলি হচ্ছিল। ক্রস হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আমাদের গুলিতেই আমাদের পুলিশ আহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু বরেন্দ্র এলাকা তাই সম্ভব হয়নি।’
প্রসঙ্গত, জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে বৃহস্পতিবার (১১ মে) ভোরে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বেণীপুরের সাজ্জাদের বাড়ি ঘেরাও করে পুলিশ। এ সময় সাজ্জাদ, তার স্ত্রী বেলি, ছেলে আল আমিন, সোহেল, মেয়ে কারিমা ও বহিরাগত আশরাফুল আত্মঘাতী হয় বলে জানায় পুলিশ। বিস্ফোরণের সময় ফায়ার সার্ভিসের আহত কর্মী আবদুল মতিনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। আহত হন পুলিশের আরও চার কর্মকর্তা। পরে সাজ্জাদের আরেক মেয়ে সুমাইয়া পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ওই আস্তানা থেকে দুই শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে।
/এমএনএইচ/