১৫ বছর ধরে আত্মগোপনে থেকে জঙ্গি কার্যক্রম চালাতো মাহফুজ

জঙ্গি আব্দুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ ওরফে জয়দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল আব্দুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ ওরফে জয়। ২০০২ সালে পাবনা জেলা স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে সে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে ছিল সে। জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার পরপরই সোহেল মাহফুজ বোমা ও গ্রেনেড তৈরির প্রশিক্ষণ নেয়।

পরবর্তী সময়ে সোহলে মাহফুজ  বোমা ও গ্রেনেড তৈরির প্রশিক্ষণ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতো। বলা হয়ে থাকে, পুরনো জেএমবির শীর্ষ যে কয়েকজন সদস্য বোমা তৈরিতে দক্ষ ছিল, তাদের অন্যতম হলো এই সোহেল মাহফুজ। ১৫ বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে থাকলেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। শুক্রবার রাত পৌনে তিনটার দিকে চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানাধীন পুস্কনিপাড় এলাকার একটি আমবাগানের টং ঘর থেকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয় তাকে। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি), পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি শাখা, বগুড়া ও চাপাইনবাবগঞ্জ থানা পুলিশ যৌথভাবে এই  অভিযান চালায়।

সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সোহেল মাহফুজ বাংলাদেশে অবস্থানকালে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিলেও আগে কখনও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েনি। সে খুব বেশি মুভ করতো না। তাই তাকে শনাক্ত করা সহজ ছিল, বোমা বানাতে গিয়ে তার একটি হাত উড়ে গেছে। এ কারণে সে আস্তানাতেই থাকতো। নব্য জেএমবির কেন্দ্রীয় নেতারা তার আস্তানায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে আসতো।’

যেভাবে জঙ্গিবাদে জড়ায় সোহেল মাহফুজ

একেবারে অল্প বয়সেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে দীর্ঘ দিন ধরে আত্মগোপনে থাকা এই শীর্ষ জঙ্গি। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ এলাকার সাদিপুর কাবলিপপাড়া এলাকায়। তার বাবার নাম রেজাউল করিম শেখ। মায়ের নাম মনোয়ারা বেগম। পাবনা জেলা স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে সে। ২০০২ সালে এক চাচাত ভাইয়ের মাধ্যমে জেএমবিতে যোগ দেয়। পড়াশোনা বাদ দিয়ে সে চলে যায় রাজশাহী। সেখানে সে বেশ কয়েক বছর জেএমবির শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের সঙ্গে থাকে। ২০০৪ বা ২০০৫ সালে বাংলা ভাইয়ের হয়ে এক আস্তানায় বোমা বানাতে গিয়ে ডান হাত উড়ে যায় তার।

সোহেল মাহফুজ

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, হাত উড়ে যাওয়ার পর সে রাজশাহী থেকে বাড়িতে চলে যায়। বাড়িতে কিছুদিন অবস্থান করার পর আবার চলে যায় সংগঠনের কাজে। ২০০৬ সালে চাপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় সংগঠনের এক দ্বীন-ই ভাইয়ের মেয়েকে বিয়ে করে। এর বছর খানেক পর দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে দ্বিতীয় বিয়ে করে। বর্তমানে সে সাত সন্তানের জনক। দুই স্ত্রী নিজ নিজ বাবার বাড়িতে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। 

বোমা তৈরিতে দক্ষ  মাহফুজ

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলেন, মাহফুজ বোমা তৈরিতে দক্ষ। হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো তৈরি করে সে। সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ‘সোহেল মাহফুজ স্বল্প-শিক্ষিত হলেও বোমা তৈরিতে অনেক দক্ষ। এ কারণে সংগঠনে তার আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হতো। জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার পর সে বগুড়া ও রাজশাহী এলাকায় বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নেয়। পরবর্তী সময়ে নিজেই প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে। ২০০৯ সালের ১৪ মে ঢাকার কাফরুল এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়ার পর পুরনো জেএমবির আরেক বোমা বিশেষজ্ঞ জাহিদুল ইসলাম সুমন ওরফে বোমা মিজান র‌্যাবের কাছে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছে, সেই নথির তথ্য অনুযায়ী, সোহেল মাহফুজ তার (বোমা মিজান) সমপর্যায়ের বোমা তৈরিতে পারদর্শী। ওই সময় মোল্লা ওমর, ওসমানসহ কয়েকজন জঙ্গিদের বোমা তৈরিতে প্রশিক্ষণ দেয়। এরমধ্যে সোহেল মাহফুজ অন্তত ১০ জনকে বোমা তৈরিতে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ডান হাত উড়ে যাওয়ার পরও সোহেল মাহফুজ বাম হাত দিয়েই বোমা তৈরি করতে পারতো। তার সঙ্গে সংগঠনের কেউ একজন সহযোগিতা করতো। ভারত থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আনার রুটটি সম্পর্কে তার জানাশোনা ছিল। এ কারণে তার তত্ত্বাবধানেই হলি আর্টিজান বেকারিতে ব্যবহৃত অস্ত্র-গ্রেনেড আনা হয়।’

 

মোস্ট ওয়ান্টেড মাহফুজ জেএমবির ভারতীয় শাখার আমির

কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তারা বলেন, ‘২০০৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ইউসুফ নামে এক জঙ্গি বগুড়ায় এসে পুরনো জেএমবির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। এ সময় ইউসুফ পশ্চিমবঙ্গে কাজ করার জন্য একজনকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। ওই সময় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও ধর-পাকড় চলায় সোহেল মাহফুজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। সেখানে সে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন নামে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে। তবে ২০০৮ সালে দেশে ঢাকাতেই অবস্থান করছিল। বোমা মিজান র‌্যাবকে দেওয়া তার স্বীকারোক্তিতে বলেছে, ‘শায়খ সাইদুর রহমানের নির্দেশে চাপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত পথে মে, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে আসি। সেলিমের তত্ত্বাবধানে চাপাইনবাবগঞ্জে একদিন থেকে ঢাকায় মাহফুজের নিকট আসি। মাহফুজ সস্ত্রীক আমাকে ডেমরার কোনাপাড়ার আসাদ ওরফে টিটুর ভাড়া বাসায় ওঠায়। সে তখন জেএমবির ঢাকা বিভাগের দায়িত্বে ছিল।’ বোমা মিজান আরও জানায়, ‘আগস্ট, ২০০৮ সালে ঢাকার অজ্ঞাত একস্থানে জেএমবির বর্তমান (তৎকালীন) আমির শায়খ মাওলানা সাইদুর রহমানের উপস্থিতিতে মিটিং হয়। মিটিংয়ে শাহবাগ এলাকা হতে শাহেদ ট্যাক্সি যোগে এক ঘণ্টার রাস্তা পেরিয়ে উক্ত স্থানে নেয়। আমিসহ রাসেল, সায়েম, সোহেল মাহফুজ, শাহেদ মিটিংয়ে উপস্থিত থাকি।’

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় থাকতো সোহেল মাহফুজ। এ সময় তার দুই স্ত্রীও সঙ্গে ছিল। পুরনো কাপড় ব্যবসার আড়ালে সে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাত। জেএমবির তৎকালীন আমির মাওলানা সাইদুর গ্রেফতার হওয়ার পর জেএমবির ইন্ডিয়ান শাখার আমির হিসেবে মনোনিত হয় এই সোহেল মাহফুজ। সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৪ সালের ২অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের পর ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাহফুজকে মোস্ট ওয়ান্টেড হিসেবে খুঁজতে থাকে। তাকে গ্রেফতারের জন্য ১০ লাখ রুপি পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। ওই বছরের নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে সে পালিয়ে আবার বাংলাদেশে আসে।’

নব্য জেএমবিতে যোগদান ও গুলশান হামলায় জড়িত

পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশে ফেরার পর সোহেল মাহফুজ পুরনো জেএমবি থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন তার সঙ্গে জহিরুল নামে একজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতো। জহিরুল তাকে মাসিক খরচ হিসেবে ৪-৫ হাজার টাকা দিত। ওই টাকা দেওয়া বন্ধ হয়ে গেলে বিপাকে পড়ে যায় মাহফুজ। পরবর্তী সময়ে রবিন নামে পূর্ব পরিচিত এক সঙ্গীর মাধ্যমে নব্য জেএমবির দাওয়াত পায় সে। রবিন তাকে একটি মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে নব্য জেএমবির কর্ম-পদ্ধতি ও আনুষাঙ্গিক বিষয় মাহফুজকে দেয়।  মাহফুজ তা দেখে ‘খিলাফত শুরু হয়েছে’ মনে করে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। ২০১৫ সালের কোনও এক সময় সে নব্য জেএমবির কাছে বায়াত গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে নিও জেএমবির দুই সদস্য রজব ও জনির মাধ্যমে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। উত্তরাঞ্চলে নব্য জেএমবির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও হয়। এছাড়া ২০১৬ সালের রমজানের শুরুতে রজবের সঙ্গে ঢাকায় আসে মাহফুজ। ঢাকায় ফরিদুল ইসলাম আকাশ তার সঙ্গে দেখা করে মিরপুরের শেওড়াপাড়ার আস্তানায় নিয়ে যায়। ওই আস্তানাতে তামিম চৌধুরী, বাশারুজ্জামান চকলেট, নূরুল ইসলাম মারজানের সঙ্গে অবস্থান করে। সেখানেই সে গুলশান হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো তৈরিতে সহযোগিতা করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালনকারী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘নব্য জেএমবি গঠনের পর নব্য জেএমবির সদস্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। পরে  মাহফুজ নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। সে দীর্ঘদিন জেএমবির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাকে মজলিসে শুরার সদস্য করা হয়।’

/এমএনএইচ/