একইসঙ্গে এসব জেলার আদালতে ৫৭৯ জন সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদও শূন্য রয়েছে। এগুলো শূন্য থাকায় একজন বিচারককে ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে সেইসব বিচারককে একাধিক আদালতের কাজ করতে হচ্ছে। এতে করে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য।
এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ‘বাংলাদেশের নিম্ন আদালত ব্যবস্থা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা পরিচালনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দেশের ৮টি বিভাগের প্রতিটি থেকে দুটি করে মোট ১৬টি জেলা ও দুটি বিভাগ থেকে বিশেষ বিবেচনায় অতিরিক্ত আরও দুটি জেলা যুক্ত করা হয় এ গবেষণায়। মোট ১৮টি জেলার ৪৩৭ জন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৬ জন বিচারকও আছেন।
ওই ১৮ জেলার ৬২১টি আদালতে ১১৪ জন বিচারকের পদ ও ৫৭৯ জন সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) সকালে ঢাকার ধানমন্ডিতে টিআইবি’র মেঘমালা সম্মেলন কক্ষে এটি প্রকাশিত হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে— ১০ লাখ মানুষের জন্য গড়ে মাত্র ১০ জন বিচারক রয়েছেন। দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে বিপুলসংখ্যক মামলা চলমান রয়েছে। প্রতিদিন এই সংখ্যা বেড়েই চলছে। এসব মামলার কর্মভার পরিচালনার জন্য সার্বিকভাবে নিম্ন আদালতগুলোতে পর্যাপ্ত জনবলের স্বল্পতা রয়েছে।
মামলার সংখ্যার তুলনায় বিচারকের ঘাটতি রয়েছে। কাজের চাপের তুলনায় অন্যান্য সহায়ক কর্মচারীর সংখ্যাও অপ্রতুল। মামলার সংখা যে আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে জনবলের সংখ্যা সেই হারে বাড়েনি। আবার সময়ের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আদালত সৃষ্টি করা হলেও সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে দেশে ১০ লাখ মানুষের জন্য গড়ে মাত্র ১০ জন বিচাররক রয়েছেন।
বিচারকদের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদও খালি থাকায় আদালতের কাজে ধীরগতি থাকছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়— আদালতগুলোতে মামলার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু মামলা বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মচারীর সংখ্যা বাড়েনি। জনবল কম থাকায় সব পর্যায়ে কাজের চাপ বৃদ্ধি পায় ও কিছু ক্ষেত্রে ধীরগতি আসে।
গবেষণার আওতাভুক্ত ১৮টি জেলার আদালতে বিচারক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘাটতির পাশাপাশি অবকাঠামোগত, আর্থিক, প্রশিক্ষণ, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, প্রতারণা ও জালিয়াতি, ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেন, প্রভাব বিস্তার ও অন্যান্য চাপ রয়েছে এসব আদালতে।
গবেষণায় এসব অনিয়ম ও ঘাটতি উঠে আসার পরও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তবে আরও ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে বলেও মন্তব্য তার।
আদালতগুলোতে বিচারকের ঘাটতি প্রসঙ্গে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বাংলাদেশে গড়ে দেড় লাখ মানুষের জন্য আছেন একজন বিচারক। এ চিত্র সারাবিশ্বে বিরল। বিচারক কম থাকায় বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি হয়।’
গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা। এ সময় ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়েরসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
টিআইবি’র এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরিতে দেশের ১৮টি জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মুখ্য তথ্যদাতা ও নিবিড় সাক্ষাৎকারদাতারা হলেন— নিম্ন আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, আইনজীবীদের সহকারী, জেলা আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি, গণমাধ্যম কর্মী ও অন্যান্যরা। এছাড়া আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে হয়েছে দলগত আলোচনা।