হানিফ পরিবহনের বাসটির সুপারভাইজার জনির জবানবন্দির বরাত দিয়ে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম জানান, ‘রবিবার (২১ জুলাই) দিনগত রাত ৪টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভাটেরচর ব্রিজের কাছে যানজটে পড়ে বাস। এ সময় জরুরি প্রয়োজনে বাস থেকে নিচে নামেন পায়েল। এরমধ্যেই যানজট কিছুটা ছাড়লে বাস এগোতে থাকে। পায়েল দৌড়ে এসে বাসে উঠতে গিয়ে নাকেমুখে আঘাত পান। সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যান রাস্তায়। এ পর্যায়ে আহত পায়েলকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বদলে মৃত ভেবে ভবেরচর ব্রিজ থেকে খালে ফেলে দেয় বাসটির চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারী। কিন্তু এ সময় যদি পায়েলকে স্থানীয় কোনও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হতো, তবে তাকে বাঁচানো যেতো।’
জায়েদুল আলম আরও বলেন, ‘ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বলছে, খালে ফেলে দেওয়ার পরও পায়েল জীবিত ছিলেন। কারণ, তার পেটে প্রচুর পরিমাণ পানি ছিল। পেটের পানিই প্রমাণ করে জীবিত পায়েলকে খালে ফেলা হয়েছিল’
পায়েলকে পানিতে ফেলে না দিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো বলে মন্তব্য করেছেন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, ‘পায়েলকে হাসপাতালে নিলে বেঁচেও যেতে পারতেন। যখন তাকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়, তখনও তিনি বেঁচে ছিলেন। কারণ লাশ উদ্ধারের পর তার পেটে পানি পাওয়া গেছে৷ মৃত মানুষের পেটে পানি যাবে না। তাদের মোটিভ যে খারাপ ছিল, তা স্পষ্ট। তারা পায়েলকে বাঁচানোর কোনও চেষ্টাই করেনি। কেন করেনি, তাও আমরা তদন্তে জানার চেষ্টা করছি। এটা একটা নির্মম হত্যাকাণ্ড।’
পানিতে ডুবেই পায়েলের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছেন ফরেনসিক এক্সপার্ট ও চিকিৎসকরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মারা যাওয়ার পর যদি পানিতে ফেলা হয়, তাহলে পেটে পানি ঢোকার কোনও সুযোগ নেই। যদি জীবিত অবস্থায় ফেলা হয়, তখন শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করবেন। সে পানি তখন তার পেটে ঢুকে যাবে।’
তবে, মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পায়েলের ময়নাতদন্তের ব্যাপারে আমি এই মুহূর্তে কিছুই বলতে পারবো না।’
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘পায়েলের ময়নাতদন্তের জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সে রিপোর্ট আমরা এখনও পাইনি। তাই এখন কিছুই বলা যাবে না।’
পুলিশের প্রেস ব্রিফিং এ পায়েলের পেটে পানি ছিল বলে সাংবাদিকদের জানানো হয়। এ প্রসঙ্গে ডা. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘তারা (পুলিশ) এটা বলতেই পারে। তাদের দিক থেকে এটা বললে ভুল বলা যাবে না। কিন্তু আমরা বলতে পারবো না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধ আছে।’
নিহত পায়েলের বাবা গোলাম মাওলা বলেন, ‘মানুষ এতটা নির্মম আর অমানবিক হতে পারে, আমি ভাবতেও পরি না৷ আমি আমার ছেলের লাশ দেখতে পারিনি৷ শুনেছি তার মুখমণ্ডল এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল৷ বাসের কর্মচারীরা জবাবনন্দি দিয়েছে৷ তারা বলেছে, ঝামেলা এড়াতে লাশ তারা নদীতে ফেলে দেয়। আমার আশঙ্কা পায়েলের সঙ্গে তাদের কোনও বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়। তার জেরে তাকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে বাসে উঠতে গিয়ে যদি আহত হয়, তাহলে তো তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা ছিল। যদি অন্যকোনো কারণ না থাকে, তাহলে মৃত ভেবে নদীতে ফেলার কী কারণ থাকতে পারে?’
উল্লেখ্য, নিখোঁজের দুই দিন পর গত ২২ জুলাই নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএ পঞ্চম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান পায়েলের লাশ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর খাল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের পরদিন (২৪ জুলাই) বাসচালক জামাল হোসেন (৩৫) ও বাসের হেলপার ফয়সাল হোসেন (৩০) ও সুপারভাইজার জনিকে (৩৮) গ্রেফতার করা হয়। ২৫ জুলাই সুপারভাইজার জনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।