৯৯৯-এ ফোন করে জীবন বাঁচলেও ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পেলেন না

ধর্ষণরাতের অন্ধকারে চার পাঁচজন যুবক এক পোশাক শ্রমিক নারীকে রাস্তায় ধাওয়া করছে, আর তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছেন ওই নারী। হঠাৎ তার মাথায় বুদ্ধি আসে জরুরি সেবা ৯৯৯ এ ফোন দেওয়ার। হাতের মুঠোফোন দিয়ে তিনি ৯৯৯-এ ফোন দেন। ওই নারীকে উদ্ধারে জরুরি সেবা থেকে নির্দিষ্ট থানায় ফোন দেওয়া হয়। থানা পুলিশকে নারীর মোবাইল নম্বরে ফোন দেয়, পুলিশ নারীর সঙ্গে কথা বলে অস্পষ্ট ঘটনাস্থল জেনে সেদিকে রওনা দেয়। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়ে ওই নারীর মোবাইল ফোন বন্ধ পায় পুলিশ। স্থানীয়দের নিয়ে সম্ভাব্য জায়গা গুলোতে পুলিশ নারীকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও পায়নি। এভাবে প্রায় আধাঘণ্টা চলে যায়। আধাঘণ্টা পর ওই নারী পুলিশকে নিজেই ফের ফোন দেয়। তখন গিয়ে পুলিশ বিধ্বস্ত অবস্থায় একটি জঙ্গল থেকে ওই তরুণীকে উদ্ধার করে। সিনেমার মতো মনে হলেও এই ঘটনা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার। যদিও পুলিশের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও ধর্ষকদের হাত থেকে উদ্ধার পাননি ওই নারী।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার কোয়াশনগরএলাকায় মঙ্গলবার রাতে এই ঘটনা ঘটেছে। রাত ১১ টার দিকে পোশাক শ্রমিক ওই নারী তার কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু সংলগ্ন বোটবাজার রোড দিয়ে মায়ের বাসা থেকে নিজের বাসায় ফিরছিলেন। এসময় ওই নারীকে ৪/৫ জন ব্যক্তি অনুসরণ করে। তাকে একা পেয়ে প্রথমে উত্যক্ত করে। এরপর তার হাত ধরে টানাটানি করে। তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে ওই ব্যক্তিরাও তাকে ধাওয়া করে। অজ্ঞাত ওই ব্যক্তিরা কোয়াশনগর পর্যন্ত তাকে ধাওয়া করে নিয়ে যায়। রাস্তার পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে তাকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। এসময় তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দেয়। মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়ার আগে তরুণী দৌড়ে জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়েছিল বলে জানিয়েছে কর্ণফুলী থানা পুলিশ ও জরুরি সেবা ৯৯৯ এর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তারা।

কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ঢাকা থেকে ৯৯৯ নম্বর থেকে জানানো হয়। ওই নারী সেখানে ফোন দিয়ে সহযোগিতা চেয়েছিল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে উদ্ধারে দুজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) কে পাঠাই। নারীকে রাতেই উদ্ধার করা হয়। তার দেখানো অনুযায়ী দুইজনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে সেলিম (৩৩) নামে এক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেছে। অপর ব্যক্তিসহ আরও কয়েকজন তাকে সহযোগিতা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। ওই নারীকে বুধবার তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হবে। আসামিদেরও আদালতে চালান করা হবে।’

ওই নারীকে রাতে উদ্ধারের অভিযানে ছিলেন কর্ণফুলী থানার এএসআই আল-আমিন ও এএসআই মোশাররফ হোসেন। এএসআই আল-আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের থানায় ৯৯৯ নম্বর থেকে ওই নারী সাহায্য চেয়েছেন বলে জানানো হয়। তারাই ওই নারী ফোন নম্বর আমাদের দেয়। আমি এবং এএসআই মোশাররফ সঙ্গে সঙ্গে মোটর সাইকেল নিয়ে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলে তাকে উদ্ধারে যাই। কিন্তু সে স্পষ্ট করে ঘটনাস্থল বলতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাই। এরপর কোয়াশনগর এলাকায় গিয়ে আমরা স্থানীয় কয়েক ব্যক্তিকে নিয়ে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে খুঁজতে থাকি। কিন্তু কোথাও পাচ্ছিলাম না। কিছুক্ষণ পর ওই নারী আমাকে ফোন দেয়। আমি তার লোকেশন জেনে সেখানে যাই। ওই নারী রাস্তায় উঠে আসেন। তবে ওই নারী কোনও ব্যক্তির নাম বলতে পারছিল না। তখন আমরা তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি দেখলে তাদের চিনবেন কিনা?’ তিনি উত্তরে বলেন, ‘হ্যাঁ’। এরপর ওই নারীকে নিয়ে অভিযান শুরু করি। প্রথমে মুরাদ (১৯) ও সোহেল (১৯) নামে দুজনকে আটক করি। তারা সেলিম (৩৩) নামে এক ব্যক্তির কথা বলে। এরপর সেলিমকে তার বাড়ি থেকে আটক করা হয়।’

এএসআই বলেন, ‘সেলিম ওই নারীকে তার সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে একটি জঙ্গলে নিয়ে যায়। এরপর জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। সোহেল ও মুরাদ তার সহযোগী ছিল। তারাও ধর্ষণের চেষ্টা করেছে। ওই নারীর ফোনটি নিয়ে তারা বন্ধ করে দেয়। এজন্য তার সঙ্গে কিছুক্ষণ যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি। এই সময়ের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিনি।’

এই ঘটনার সঙ্গে ৪/৫ জন জড়িত ছিল বলে ওই নারীর বক্তব্যে জানা গেছে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ।

জাতীয় জরুরি সেবা বিভাগের পুলিশ সুপার মো. তবারক উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই নারীর ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি আমরা। তাকে উদ্ধারে কর্ণফুলী থানা পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে যায়। তবে নারীর ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়া, তার অবস্থান তাৎক্ষণিক নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তারপর যখন তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়া গেছে, সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ তাকে উদ্ধার করেছে। অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে।’

পোশাক শ্রমিক ওই নারীর বর্ণনা অনুযায়ী তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন দুজনকে আটকের কথা জানিয়েছেন। একজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এক সন্তানের জননী ওই নারী বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।