বুধবার (৩০ অক্টোবর) সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমানের আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে তারা বক্তব্য দেয়। বাকি ছয় আসামির লিখিত বক্তব্য আদালতে জমা করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের জন্য আগামী ৬ নভেম্বর দিন ধার্য করেন আদালত।
জাহাঙ্গীর আলম জবানবন্দিতে জানায়, ‘আমি ২০০২ সালে জেএমবিতে যোগদান করি। ২০১৪ সাল পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব পালন করি। ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় খেলাফত কায়েমের ঘোষণা করলে তামিম চৌধুরী ও সারোয়ার জাহান মানিকের মাধ্যমে আনুগত্য শিকার করি।
‘২০১৪ সালের পর আমাকে তামিম চৌধুরী ও সারোয়ার জাহান মানিক উত্তরবঙ্গের সামরিক শাখার প্রধান বানিয়ে দেন। এরপর থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করি। জাপানি নাগরিক হিশোতিকে হত্যা করি।’
‘কুড়িগ্রামে মুসলমান থেকে খ্রিস্টান ধর্মে আসায় হোসেন আলীকে হত্যা করি। এমন আরও কিছু অভিযান পরিচালনা করি। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের দায়িত্ব পালন করি। ২০১৬ সালের ১ মার্চ জঙ্গি মারজান থ্রিমা অ্যাপসের মাধ্যমে ফুড ভিলেজে আসতে বলে। বিকাল চারটায় সেখানে উপস্থিত হই। ওই দিন মারজান শফিকুল ইসলাম ও রোহান ইমতিয়াজ স্বপন নামের দুজন ব্যক্তিকে দেয় আমার সঙ্গে। এদের দুজনকে নিয়ে কয়েকটা অভিযান পরিচালনা করি।
‘২০১৬ সালের ৫ মে সিরাজগঞ্জের হানিফ হোটেলে আসতে বললে আমি বেলা ৩টায় সেখানে পৌঁছাই। সেখানে তিনজন ব্যক্তিকে নিয়ে আসতে বললে আমি তাদের নিয়ে আসি। স্বপন, খাইরুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলকে নিয়ে মেজর জাহিদ চলে যায়। আমার জানা মতে গুলশান হামলায় যারা জড়িত ছিল তাদের প্রশিক্ষণ দেয় তারা। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ তামিম চৌধুরী থ্রিমা অ্যাপসের মাধ্যমে ঢাকা চিড়িয়াখানায় আসতে বললে আমি সেখানে যাই। তামিম, মানিক, চকলেট, মারজান, নাঈম, তারেক ও তাওসিফকে সেখানে দেখতে পাই।
‘তামিম তখন আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করে। এ সময় তামিম তাদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেয়। তামিম সারোয়ার তাওসিফকে কিছু গ্রেনেড তৈরি করতে বলে। চকলেট, নাঈম ও তারেককে বোমা সরবরাহ থেকে শুরু করে সব দায়িত্ব প্রদান করে। এরপর আমি সেখান থেকে চলে যাই। উত্তরবঙ্গে বেশকিছু অভিযান পরিচালনার কারণে আমাকে প্রশাসন খুঁজছিল। তখন তামিম ভাইকে বিষয়টি জানালে তিনি আমাকে ঢাকায় আসতে বলেন। বিকাল তিনটায় কল্যাণপুর হানিফ কাউন্টারে পৌঁছাপলে বাশিরুজ্জামান চকলেট আমাকে রিসিভ করে। তখন তারা আমাকে বসুন্ধরার বাসায় নিয়ে যায়।
‘বাসায় ঢুকতেই মানিক, তামিম চৌধুরী, তানভীর কাদেরি, তার দুই ছেলে, চকলেট, স্বপন, খাইরুল ইসলাম, উজ্জ্বল, মোবাশ্বের, নিবরাসকে দেখতে পাই। পরের দিন মারজান ওই বাসায় চলে আসে। তারা বিভিন্ন সময় মিটিং করতে থাকে। মাঝে মাঝে আমাকে ডাকতো মিটিংয়ে। ২০ মার্চ যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তারা সরঞ্জাম সরবরাহ শুরু করে। তা সংগ্রহ করে বসুন্ধরার বাসায় নিয়ে আসে। চকলেট অস্ত্র নিয়ে আসে এবং তারেক ও নাঈম গ্রেনেড নিয়ে আসে। আমি, স্বপন, পায়েল ও শফিকুল ইসলামকে জিজ্ঞাসা করি কোথাও কি বড় হামলা হবে? তারা বলে আমরা সঠিক জানি না। ২৭ জুন তাদের আবার এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি, তখন তারা বলে তামিম চৌধুরী আমাকে বেশকিছু জায়গা দেখতে বলেছে।
‘তখন তামিম আমাকে বলে আপনি ১ জুলাই বাসা থেকে চলে যাবেন। তখন পর্যন্ত তামিম, মারজান, মানিক ছাড়া কেউ জানতো না কোথায় হামলা হবে। ১ জুলাই সকাল ৮টায় খাইরুল ইসলাম ও বাধন আমাকে বলে ঢাকায় হামলা হবে। কোথায় হামলা হবে তা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। এরপর তামিম ও মানিক আমাকে বলে, যেখানে ছিলেন সেখানে চলে যান। আর ভাখইদের জন্য দোয়া করবেন। কোনও সময়ের জন্য যেন মোবাইল বন্ধ না হয়।
‘১ জুলাই বেলা ১১টার দিকে আমি ওই বাসা থেকে সিরাজগঞ্জে চলে যাই। থ্রিমা অ্যাপসের মাধ্যমে সন্ধ্যা সাতটায় খবর দেখতে বলে। আমাকে বলে ভাইদের জন্য দোয়া করতে থাকেন যেন তাদের আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করে।
‘৩ জুলাই তামিম ও মারজান আমাকে মিরপুর ১০-এ ডেকে ৫০ হাজার টাকা দেয়। ১০ জুলাই রমজানকে আমি ঢাকায় ডাকি। তাকে কল্যাণপুরে রিসিভ করতে গিয়ে কাউন্টার টেরোরিজমের হাতে ধরা পড়ি।’
এ জবানবন্দি শেষে হাসতে হাসতে এতে স্বাক্ষর করে জাহাঙ্গীর।
এরপর জবানবন্দি দেয় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান। এই আসামি জানায়, ‘আমার কথা হলো আমি কোনও প্রকার অন্যায় করিনি। আমি স্বাভাবিকভাবে মাছের ব্যবসা করতাম। আমি সেই মিজান নই, আমি মাছ ব্যবসায়ী মিজান। শুধু নামের কারণে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে বগুড়ার ডিবি পুলিশকে জানাই। ওরা ১৬ দিন আমাকে রেখে তদন্ত করে। ওখানে চার মাস থাকার পর এডিসি সানোয়ার হোসেন তদন্ত করে একটি মামলা দিয়ে ছেড়ে দেন। আমি কিছু করিনি। আমি কিছুই জানি না। আমি মাছ ব্যবসা করতাম।’
এই আসামি আরও দাবি করে, ‘এর কিছুদিন পর এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীরের হাতে আমাকে তুলে দেওয়া হয়। হুমায়ুন কবীর আমাকে হলি আর্টিজান মামলার আসামি করে ১০ দিনের রিমান্ড চান। আদালত আমার ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ৭ দিনের রিমান্ডে আমাকে ৪-৫ ঘণ্টা ধরে হাত ওপরে করে ঝুলিয়ে রাখতো। আমাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করে ফেলতো। এরপর আবার তিন দিনের রিমান্ডে যায়। রিমান্ডে নিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। হুমায়ুন আমাকে বলে জবানবন্দি না দিলে আমাকে নাকি ছাড়বে না। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দেওয়ার জন্য আমাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আমি মনে রাখতে পারিনি। এরপরও আমাকে আদালতে নিয়ে গিয়ে জবানবন্দি দেওয়ায়। তখন কী বলেছি বলতে পারবো না। আমি গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ। কিছু বুঝি না, কিছুই জানি না। আমি কোনও অপরাধ করিনি।’
তাদের জবানবন্দি শেষে বিচারক যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ৬ নভেম্বর দিন ধার্য করেন।