ভাষার মাসের সম্মানে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টা মামলার রায় হলো বাংলায়

চলছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দুর্বার আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ আরও অনেকে। তাদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি পেয়েছিল মাতৃভাষার মর্যাদা। আর সে কারণেই ভাষা শহীদদের এবং ভাষার মাসকে সম্মান জানাতে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় বাংলাতে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।   

বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উল্লাহ। অপরদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. নাসির উদ্দিন ও মোহাম্মদ আহসান।

পরে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজ হাইকোর্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন। রায়টি সংক্ষিপ্ত করে পাঠ করেছেন আদালত। যেহেতু ভাষার মাস চলছে, তাই ভাষার মাসের প্রতি সম্মান জানাতে আদালত এ মামলার রায় বাংলা ভাষায় ঘোষণা করেছেন।

এর আগে হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ আসামির সাজা বহাল রাখা হয়। ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি বিচারিক আদালতে আসামি মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়াও আসামি আনিসুল ওরফে আনিস, মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান এবং সরোয়ার হোসেন মিয়াকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের দণ্ড দেন বিচারিক আদালত।

তবে এসব আসামির মধ্যে মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বহাল, আসামি আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিস ও মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমানের ১৪ বছর সাজা খাটা হলে মুক্তি প্রদান এবং আসামি সরোয়ার হোসেন মিয়াকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।

২০১৭ সালের ২০ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মমতাজ বেগম ১০ জঙ্গির সর্বোচ্চ শাস্তি দেন। আদালত গুলি করে প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। এছাড়া চার আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—ওয়াশিম আখতার ওরফে তারেক হোসেন, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম, মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর।

পরে এ মামলার রায়সহ সব নথি ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর প্রধান বিচারপতির কাছে নথি উপস্থাপন করা হলে তিনি জরুরি ভিত্তিতে এ মামলার পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেন। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এরইমধ্যে পেপারবুক তৈরি হলে হাইকোর্টে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। কিন্তু হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কয়েকবার পুনর্গঠন হওয়ায় মামলাটির শুনানি পিছিয়ে যায়। বুধবার মামলার শুনানি শেষে রায় দিলেন হাইকোর্ট।

প্রসঙ্গত, ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছনে এ বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন কোটালীপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন একটি মামলা দায়ের করেন।

পরে ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালের ২৯ জুন আরও ৯ জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা-২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।