‘জিনের বাদশার’ খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব খোকন

ছোট একটি খাবারের দোকান থেকে বড় রেস্টুরেন্টের মালিক হয়েছিলেন শাহাদুজ্জামান খোকন। প্রতিমাসে কয়েক লাখ টাকা আয়। কিন্তু আরও ধনী হতে চেয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে রেস্টুরেন্টের নিয়মিত কাস্টমার আব্দুল খালেকের কাছে সন্ধান পান কথিত ‘জিনের বাদশার’। প্রলোভন আর কৌতুহল থেকে তিনি একটি বালতি কিনে আনেন। পানি আর টুথপেস্ট ভর্তি সেই বালতি থেকে চোখের পলকে ১৫ হাজার টাকা আবিষ্কার করেন ‘জিনের বাদশা’।

শাহাদুজ্জামানের লোভ আর কৌতুহল বাড়তে থাকে। ৬ কোটি টাকা বানানোর জন্য শাহাদুজ্জামান আর খালেক ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দেন। আরও সবশের্ষ দুই লাখ টাকা জোগাড় করতে শাহাদুজ্জামান বউয়ের গহনা বিক্রি করতে গেলে বিপত্তি শুরু হয়। স্ত্রী রেগে টাকা বানানোর বাক্স ভেঙে ফেলেন। তা থেকে বেরিয়ে আসে শুধু কাগজ। তারা বুঝতে পারেন যে, প্রতারণার শিকার হয়েছেন। পরে তারা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) অভিযোগ করলে জিনের বাদশা তরিকুল ইসলামসহ চারজনকে গ্রেফতার করেন।

বুধবার (১০ মার্চ) দুপুরে সিআইডি সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক।  গ্রেফতার হওয়া অন্য তিনজন হলেন আব্দুল্লাহ বিশ্বাস, আল মাসুম ও সাইদুল ইসলাম (রাজু)।

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, ভুক্তভোগী মো. আব্দুল খালেক খানের স্ত্রী ও সন্তান দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিল। এরমধ্যে পরিচয় হয় কথিত ‘জিনের বাদশা’ তারিকুল ইসলামের সঙ্গে। যোগাযোগের এক পর্যায়ে ‘জিনের বাদশা’ খালেকের স্ত্রী-সন্তানের চিকিৎসা শুরু করেন। ওষুধে খালেকের স্ত্রী-সন্তান কিছুটা সুস্থ হয়। সুস্থ হওয়ার পর ‘জিনের বাদশার’ প্রতি খালেকের বিশ্বাস জন্মে। তাদের যত টাকা দরকার তত টাকা ‘জিনের বাদশা’ তৈরি করে দিতে পারবেন। প্রমাণ হিসেবে ‘জিনের বাদশা’ খালেকের সামনেই একটি বালতির মধ্যে রাখা সাদা কাগজে এক হাজার টাকার চকচকে নোট তৈরি করে দেয়। আরও বেশি বিশ্বাসের জন্য খালেক জিনের বাদশাকে বলেন, আপনি কিছু পুরাতন টাকা তৈরি করে দেখান। এরপর তিনি ওই বালতির মধ্যে কিছু পুরাতন টাকাসহ ১৫ হাজার তৈরি করে দেখান। ম্যাজিকের মতো এমন ঘটনা দেখে খালেকের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।

সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, খালেক ও শাহাদুজ্জামান চাহিদা অনুযায়ী ৬ কোটি টাকা ‘জিনের বাদশাকে’ তৈরি করে দিতে চান। তবে তার শর্ত অনুযায়ী পৃথীবির সব মসজিদে একটি করে কোরআন শরীফ কিনে দিতে হবে। কোরআন শরীফগুলো কিনতে এক কোটি ৬৬ লাখ টাকা লাগবে। চাহিদার ৬ কোটি টাকা একটি কার্টনে সাদা কাগজ দিয়ে তৈরি করে দেবে জিনের বাদশা।

তার কথায় বিশ্বাস করে বাজার থেকে ৬ কার্টন এ ফোর সাইজের সাদা কাগজ কিনে আনেন তারা। কাগজ কিনে আনার পর ‘জিনের বাদশা’ বলেন, আপনারা যতদিন কোরআর শরীফ কেনার জন্য এক কোটি ৬৬ লাখ টাকা দিতে পারবেন না ততদিন কার্টনটি খোলা যাবে না। এ কথায় বিশ্বাস করে আব্দুল খালেক কার্টনটি নিয়ে ঘরের এক কোনায় রেখে দেয়।

সিআইডির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘জিনের বাদশা’র এমন প্রলোভনে আব্দুল খালেক দফায় দফায় এক কোটি ১৩ লাখ টাকা জিনের বাদশাকে দেয়। শাহাদুজ্জামান দেন আরও ৫৩ লাখ টাকা। এক কোটি ৬৬ লাখ টাকা হতে আরও দুই লাখ টাকা বাকি থাকে। বাকি দুই লাখ টাকা। তখন শাহাবুদ্দিনের স্ত্রী রেগে কার্টন ছিড়ে শুধু কাগজ দেখতে পান। বুঝতে পারেন তারা প্রতারিত হয়েছেন।

প্রতারক চক্রের বিষয়ে ভুক্তভোগী সিআইডিতে অভিযোগ দিলে সিআইডির ঢাকা মেট্রো-পশ্চিম এর একটি টিম ফাঁদ পেতে তাদেরকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেট কার, নগদ ১৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, দুইটি ভেকু, টাকা তৈরির সাদা কাগজসহ বাক্স, মাজারের মাটি, লাল কালিতে আররি লেখা কাগজ জব্দ করা হয়।

শাহাদুজ্জামান খোকন বলেন, প্রলোভন আর কৌতুহল থেকে সব কিছু বিক্রি করে প্রতারক চক্রকে টাকা দিয়েছিলাম। গাড়ি, জমিসহ সব সম্পদই বিক্রি করেছিলাম। বাকি ছিলো স্ত্রীর গয়না। গয়নাগুলো যখন বিক্রি করতে যাই তখন স্ত্রী রেগে কাগজ ভর্তি কার্টন ছিড়ে ফেলে। তখন দেখতে পাই শুধু কাগজ। তখন ‘জিনের বাদশা’র সঙ্গে যোগাযোগ করে তার আচরণ দেখে বুঝতে পারি প্রতারিত হয়েছি। এরপর পুলিশে অভিযোগ করি।