চূড়ান্ত বিচারে নিজামীর ফাঁসি

‘নিজামীর মন্ত্রিত্ব লাখো শহীদের প্রতি চপেটাঘাত’

মতিউর রহমান নিজামী (ফাইল ছবি)‘একাত্তরে ন্যাক্কারজনক ভূমিকার পরও বিগত জোট সরকারের আমলে মতিউর রহমান নিজামীকে মন্ত্রিত্ব উপহার দেওয়ার ঘটনা লাখো শহীদের প্রতি চপেটাঘাত এবং বড় ধরনের ব্লাণ্ডার।’ জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়ার সময় পর্যবেক্ষণে এই বলেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে আজ তার আপিলের রায় দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
বুধবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত ২, ৬, ৭, ৮ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে দেওয়া সাজা বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর মধ্যে ২, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখা হয়েছে।  
এর মধ্যে ১৬ নম্বর অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছিল। যা প্রমানিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। ১৬ নম্বর অভিযোগ অনুযায়ী, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঊষালগ্নে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে আল-বদর বাহিনী। দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নির্মূল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আলবদর সদস্যরা ওই গণহত্যা ঘটায়। জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে ওই গণহত্যার দায় নিজামীর ওপর বর্তায়।বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে নিজামীর ফাঁসি

ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আসামিপক্ষ দাবি করেছেন মতিউর রহমান নিজামী একজন প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত। তাই যদি হয়, তারপরও কোরআনের আদেশ ও মহানবীর শিক্ষার পরিপন্থী হয়ে আলবদর বাহিনী গঠন করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিকামী মানুষদের হত্যা ও নিধন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর কর্মকাণ্ডকে সহযোগিতা ও অনুমোদন আদায়।
নিজামীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(সি), ৩(২)(জি), ৩(২)(এইচ), ৪(১), ৪(২) ধারায় মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উসকানি ও সহায়তা দেওয়া, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মোট ১৬টি ঘটনায় অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৪(১)ও ৪(২)ধারায় আনা হয় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির অভিযোগ।
১৯৯১ সালের পর ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি জয়ী হন এবং তখনকার সরকার তাকে প্রথমে কৃষি মন্ত্রী ও পরে শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়।

কারাগারের পথে প্রিজন ভ্যানের ভিতরে নিজামী (ফাইল ছবি)
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, ‘এটা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন যে, সক্রিয়ভাবে যিনি বাংলাদেশে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন, তাকে এই প্রজাতন্ত্রের মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন সরকার কর্তৃক এই অভিযুক্তকে মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া একটা বড় ধরনের ব্লান্ডার ছিল। পাশাপাশি এটা ৩০ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রম হারানো দুই লাখ নারীর প্রতি ছিল সুস্পষ্ট চপেটাঘাত।’
২০০১ সালে জোট সরকার গঠনের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলেন নিজামীকে। যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদও সে সময় মন্ত্রিত্ব পান। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত ২০ নভেম্বর এই অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কাযকর করা হয়।

/এফএস/